প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জাপান সফরের ফলস্বরূপ একটি উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি অর্জিত হয়েছে। মাতারবাড়িকে কেন্দ্র করে ‘বিগ-বি ইনিশিয়েটিভ’ বাস্তবায়িত হলে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এতে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তারা মনে করেন, এ সফরের মাধ্যমে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও দৃঢ় হচ্ছে, যা ভূরাজনৈতিক অবস্থানে বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন ও মালয়েশিয়া সফরের পর জি-সেভেন জোটের সদস্য জাপান সফর করেন। চার দিনের এই সফরে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ২৩টি নথিতে স্বাক্ষর হয়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক এখন কৌশলগত অংশীদারত্বের স্তরে পৌঁছেছে। দুই দেশের সরকারপ্রধান এ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল হাসান মন্তব্য করেন, তারেক রহমানের জাপান সফরটি গতানুগতিক ছিল না। অটোমোবাইল, প্রযুক্তি এবং মাতারবাড়িতে বিজনেস হাবসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে কূটনীতি ও অর্থনীতির বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে আলোচনা হয়েছে। এটি পূর্ববর্তী সফরগুলোর তুলনায় ব্যতিক্রমী ছিল।
তিনি আরও বলেন, সফরের জন্য বাংলাদেশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। সাধারণত বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে প্রস্তুতির অভাব দেখা যায়, কিন্তু যৌথ ঘোষণার ভাষা দেখে মনে হয়েছে, বাংলাদেশ যথেষ্ট তথ্য ও প্রস্তাবনা দিয়েছে। এটি আগের যেকোনো সফরের তুলনায় বড় ধরনের ব্যতিক্রম।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির জানান, জাপান বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়ে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত। ৬ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে অতিরিক্ত ২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার। তবে বাংলাদেশের বাণিজ্যে ঘাটতি প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সম্প্রতি রফতানি বৃদ্ধি পেলেও বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং রফতানি বাড়াতে ঢাকা গুরুত্ব দিয়েছে।
ড. মাহফুজ কবির বলেন, জাপান সরাসরি বেসরকারি বিনিয়োগে আগ্রহী। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন এবং বাংলাদেশি জনশক্তি রফতানির বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
সফরের আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে জাপানের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ’ বা বিগ-বি অন্যতম। এ উদ্যোগে ভারতের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জাপানের আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিগ-বির সম্ভাব্য পরিধি ভারতের সেভেন সিস্টারস অঞ্চল, মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে এই উদ্যোগের মূল কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ কীভাবে এ উদ্যোগ থেকে সর্বাধিক সুবিধা পেতে পারে, তা নিয়ে আরও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।
ড. মাহফুজ কবির বলেন, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলভিত্তিক হাব গড়ে তোলার বিষয়টিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। অন্য কোনো কৌশলগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে সেটি হবে দ্বিতীয় লক্ষ্য। বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলো বিগ-বি উদ্যোগে একসঙ্গে যুক্ত হলে তা সবার জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল হাসান মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের পক্ষে পুরো বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলেও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে সে ভূমিকা পালনের জন্য উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। আঞ্চলিক সংহতির বিষয়টি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা রয়েছে।
জাপান সফরে অর্থনৈতিক অর্জনের পাশাপাশি কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল হাসান জানান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি জাপানের সমর্থন আদায় সফরের অন্যতম বড় অর্জন।
কামরুল হাসান বলেন, কী প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গারা পূর্ণ নাগরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে মিয়ানমারে ফিরে যাবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়েছে জাপান।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেলেও শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জাপান হিসাব-নিকাশ করেই সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অনেকটাই নির্ভর করবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতি ও পরিবেশের ওপর।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন