প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী অভিঘাতে বিপন্ন উপকূলীয় জেলা বরগুনা। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির সংকটের ফলে জনজীবনে চরম সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কৃষিজমি, বসতভিটা, মৎস্যসম্পদ ও গ্রামীণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে মানুষের জীবন-জীবিকা ব্যাহত হচ্ছে। দুর্যোগের ক্ষতি সামাল দিতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও উপকূলের মানুষের নিরাপত্তা ও টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বরগুনার অর্থনীতি প্রধানত কৃষি, মৎস্য আহরণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জেলার বিষখালী, পায়রা ও বলেশ্বর নদ এবং উপকূলীয় জনপদে বসবাসকারী মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার এবং দুর্যোগের ঝুঁকি এই নির্ভরশীলতাকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে।
নদীভাঙনে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেক নদীতীরবর্তী মানুষ। তালতলী, পাথরঘাটা, আমতলী, বেতাগী, বামনা ও বরগুনা সদর উপজেলার বিভিন্ন নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙন এবং বেড়িবাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গত মে মাসে তালতলীর নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের তেঁতুলবাড়ী এলাকায় পায়রা নদীর তীরবর্তী বেড়িবাঁধের একটি অংশে ফাটল ও মাটিধসের সৃষ্টি হয়। এর ফলে আশপাশের গ্রামের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নদীভাঙনে জমি হারানোর পাশাপাশি পরিবারগুলো হারায় বসতঘর, গাছপালা ও জীবিকার অবলম্বন। পুনর্বাসন ও নতুন করে ঘর নির্মাণের ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।
বরগুনা জেলা শহরে বসবাসরত হযরত আলী হাওলাদার নদীভাঙনের দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাতের শিকার। একসময় স্বচ্ছল জীবনযাপন করলেও নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে এখন সরকারি খাসজমিতে নির্মিত একটি জীর্ণ ঘরে তাঁর দিন কাটছে।
তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, 'একসময় নিজের ঘরবাড়ি ছিল, সংসার চলত। কখনো ভাবিনি নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য জায়গায় এসে এভাবে থাকতে হবে। নদীভাঙনে সব হারানোর পর আগের অবস্থায় আর ফিরতে পারিনি। এখন এই ছোট, জীর্ণ ঘরেই দিন কাটে। আগে নিজের জমি ও বাড়ি নিয়ে যে নিশ্চিন্ত জীবন ছিল, এখন সেই নিশ্চয়তা নেই।'
হযরত আলীর মতো নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ শুধু জমি বা ঘর হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে হারিয়ে যায় সঞ্চয়, সামাজিক অবস্থান, পরিচিত পরিবেশ এবং নতুন করে জীবন গড়ার সামর্থ্য। স্থায়ী পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে বাধ্য হন।
লবণাক্ততা বরগুনার আরেকটি বড় সংকট। উপকূলীয় কিছু এলাকায় পুকুর, খাল ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার কারণে নিরাপদ পানীয় জল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বরগুনার বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে লবণাক্ততার ঝুঁকি ইতোমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে। নিরাপদ পানির উৎস নির্ধারণে স্থানভিত্তিক পরীক্ষা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকেরা। পানির সংকটে বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ভোগান্তি বাড়ছে। দূর থেকে পানি সংগ্রহ এবং পরিবারের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী এলাকার জরিনা বেগম সেই সংকটেরই একজন ভুক্তভোগী। পরিবারের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে তাঁকে দূরের উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে ঘরের অন্যান্য কাজ সামলানোর পাশাপাশি সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হচ্ছে।
তিনি নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, 'সংসারের রান্নাবান্না, খাওয়া আর ছেলেমেয়েদের জন্য নিরাপদ পানি জোগাড় করতে অনেক কষ্ট হয়। কাছাকাছি সব জায়গার পানি পান করার উপযোগী নয়। তাই দূরের উৎস থেকে পানি আনতে হয়। পানি সংগ্রহ করতেই অনেকটা সময় চলে যায়। আমাদের এলাকায় নির্ভরযোগ্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা থাকলে এত কষ্ট করতে হতো না।'
নিরাপদ পানির অভাব উপকূলীয় নারীদের ওপর বাড়তি শ্রমের বোঝা তৈরি করছে। একই সঙ্গে পানির গুণমান নিশ্চিত না হলে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নিরাপদ পানির স্থায়ী উৎস তৈরি এবং বিদ্যমান উৎসগুলোর নিয়মিত পরীক্ষা তাই জরুরি।
জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব কৃষিতেও পড়ছে। লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ফসল, বীজতলা, পুকুর এবং গবাদিপশুর ক্ষতি হয়। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কৃষকের আয় কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে সার, বীজ, সেচ ও শ্রমের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাষাবাদ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
তালতলী উপজেলার আবদুল করিম নামের এক কৃষকের অভিজ্ঞতা এই অনিশ্চয়তার চিত্র তুলে ধরে। তিনি বলেন, জমিতে লবণাক্ততার প্রভাব এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফসলের কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। উৎপাদন খরচ উঠে না। সংসার চালানো ও পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদের অর্থ জোগাড় করা নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।
আবদুল করিম বলেন, 'জমিতে ঠিকমতো ফসল না হলে আমাদের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। চাষ করতে আগে টাকা খরচ করতে হয়। কিন্তু লবণাক্ততা, অনিয়মিত বৃষ্টি আর জমিতে অতিরিক্ত পানি জমে থাকার কারণে ফসল নষ্ট হলে সেই টাকা আর ওঠে না। তখন ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। জমি আছে, কিন্তু জমি থেকে আগের মতো আয় হয় না। নেই জীবন জীবিকার নিশ্চয়তা।'
কৃষকের এই সংকট মোকাবিলায় লবণসহিষ্ণু ফসলের সম্প্রসারণ, মাটির লবণাক্ততা পরীক্ষা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি কৃষকদের সময়োপযোগী পরামর্শ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বরগুনার জেলেদের জীবনেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বৈরী আবহাওয়া ও ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে না পারলে আয় বন্ধ থাকে। নৌকা ও জালের ক্ষতি হলে নতুন করে কাজ শুরু করতে অর্থের প্রয়োজন হয়। তবে মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া কিংবা জেলেদের আয়হানির সব কারণকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা না গেলেও অতিরিক্ত আহরণ, মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা, বাজারদর ও পরিচালন ব্যয়ের প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণাতেও পরিবর্তনের অনুভূতি তৈরি করছে। বরগুনা সদরের বড় লবণগোলা জামে মসজিদের ইমাম মো. নজরুল ইসলাম মনে করেন, ঋতুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ও সময়ের পরিচিত ছন্দে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তিনি নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেন, 'ছয় ঋতুর বাংলাদেশের যে পরিচিত রূপ আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি, এখন তার সঙ্গে বাস্তবতার অনেক অমিল মনে হয়। কখনো দীর্ঘ সময় প্রচণ্ড গরম, কখনো অসময়ে বৃষ্টি, আবার শীতও ঠিক সময়ে অনুভব করা যায় না। প্রকৃতির পরিবর্তন দেখে আগে অনেকটা বোঝা যেত কোন ঋতু চলছে। এখন সেই স্বাভাবিক ছন্দ যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।'
ইমাম মো. নজরুল ইসলামের এই পর্যবেক্ষণ উপকূলের মানুষের আবহাওয়া পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করছে। দুর্যোগের পর পানির উৎস দূষিত হলে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অতিরিক্ত গরমে শ্রমজীবী মানুষ অসুস্থতার ঝুঁকিতে পড়েন। সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবা গ্রহণ ব্যাহত হয়। বারবার দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আয় কমে গেলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও খাদ্য ব্যয়ের মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বলেন, জলবায়ুজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা, বেড়িবাঁধের ভাঙন রোধ, নৌপথের নাব্যতা সংকট নিরসন, লবণাক্ততা মোকাবিলা, বাস্তুহারা জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন এবং সরকারি সেবা জোরদার করা জরুরি।
বরগুনার জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, নিরাপদ পানির উৎস সংরক্ষণ, জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি সম্প্রসারণ এবং দুর্যোগকালীন আশ্রয় ও পুনর্বাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এসব উদ্যোগে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়াও জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের দায় একা উপকূলের মানুষের নয়, অথচ এর ক্ষতির ভার তাদেরই বেশি বহন করতে হচ্ছে। নদী, সাগর ও কৃষিজমিনির্ভর বরগুনার মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় এখনই সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন