প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মৃত্যুর আগে রেখে যাওয়া চিরকুটে সহকর্মীর প্রতি আস্থা; সাংবাদিক নেতৃত্বের মানবিকতা নিয়ে সামনে এলো কঠিন প্রশ্ন
বরিশালের সাংবাদিক অঙ্গনে নেতৃত্ব, সহকর্মীদের প্রতি দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে সাংবাদিক পুলক দার মৃত্যুর আগে রেখে যাওয়া একটি চিরকুট। মৃত্যুর আগে তাঁর রেখে যাওয়া কথাগুলো শুধু একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতি নয়, বরং সহকর্মীর প্রতি আস্থা ও দায়িত্ববোধের বিষয়টিও সামনে এনেছে।
জানা গেছে, পুলক দা মৃত্যুর আগে পাঁচটি চিরকুট রেখে যান। সেগুলো পুলিশের জব্দ তালিকায় রয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে একটি চিরকুট বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেনকে উদ্দেশ্য করে লেখা।
চিরকুটে পুলক দা জাকির হোসেনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও স্মৃতির কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তাঁর মৃত্যুর পর মরদেহ যেন কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় এবং পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর রাখার জন্য জাকির হোসেনের প্রতি অনুরোধ জানান।
এই একটি চিরকুটই এখন সামনে আনছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একজন সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে কাকে নিজের আস্থার জায়গা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন?
বরিশালের সাংবাদিক অঙ্গনে এস এম জাকির হোসেনকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা মত, আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে। তাঁর নেতৃত্ব ও পেশাগত ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। আবার সহকর্মীদের একটি অংশ তাঁর পাশে থাকার কথাও বলে থাকেন। মতপার্থক্য ও সমালোচনা থাকতেই পারে; কিন্তু পুলকের শেষ চিরকুট সেই বিতর্কের বাইরে একটি ব্যক্তিগত ও মানবিক বাস্তবতা সামনে এনেছে।
কারণ, বরিশালের সাংবাদিক অঙ্গনে বহু পরিচিত, প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী সহকর্মী থাকা সত্ত্বেও পুলক দা তাঁর পরিবারের বিষয়ে শেষ অনুরোধটি করেছেন এস এম জাকির হোসেনকে উদ্দেশ্য করে।
এখানেই সামনে আসে নেতৃত্বের প্রকৃত অর্থ নিয়ে প্রশ্ন।
নেতৃত্ব কি শুধুই একটি পদ?
নাকি একজন সহকর্মীর দুঃসময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতাই নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয়?
সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে পেশাগত ঝুঁকি, চাপ, মামলা-মোকদ্দমা, আর্থিক সংকট কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিকূলতা অনেক সময় সহকর্মীদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করে। সেই সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন মানুষ থাকা একজন সাংবাদিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্বে থাকতে পারেন, কেউ নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে পারেন, আবার কেউ নিজেকে সহকর্মীবান্ধব হিসেবেও তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু বাস্তব পরীক্ষা আসে তখনই, যখন কোনো সহকর্মী বিপদে পড়েন।
তখন প্রশ্ন থাকে—কে পাশে দাঁড়ান? কে কথা শোনেন? কে প্রয়োজনের সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন? আর কে একজন অসহায় সহকর্মীর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব নেন?
পুলকের শেষ চিরকুট সেই প্রশ্নগুলোই যেন আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
তবে তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে কোনোভাবেই মহিমান্বিত বা আত্মহননকে সমর্থন করার উপাদান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে সাংবাদিক সমাজসহ পুরো সমাজের জন্য যে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
একজন সহকর্মী যেন সংকটের মুহূর্তে নিজেকে একা মনে না করেন—সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার জায়গাটি আরও শক্তিশালী হোক—এটাই হওয়া উচিত প্রত্যাশা।
পুলক দার শেষ চিরকুটে এস এম জাকির হোসেনের প্রতি যে ব্যক্তিগত আস্থার প্রকাশ ঘটেছে, তা বরিশালের সাংবাদিক সমাজে নেতৃত্ব ও মানবিকতার সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে।
সমালোচনা থাকুক, মতপার্থক্য থাকুক, নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকুক—কিন্তু একজন সহকর্মী বিপদে পড়লে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জায়গায় যেন কোনো সংকীর্ণতা না থাকে।
কারণ নেতৃত্বের আসল পরিচয় পদ-পদবিতে নয়; একজন সহকর্মীর দুঃসময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা।
পুলক দার শেষ চিরকুট হয়তো তাঁর ব্যক্তিগত শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি সাংবাদিক সমাজের সামনে একটি কঠিন আত্মজিজ্ঞাসাও রেখে গেছে—
আমরা কি এমন একটি সাংবাদিক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে বিপন্ন একজন সাংবাদিক শেষ মুহূর্তেও কোনো সহকর্মীকে নিজের আস্থার জায়গা হিসেবে ভাবতে পারেন?
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন