প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন একাই চিকিৎসা বাবদ ৮১ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৮ টাকা নিয়েছেন।
তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন থাইল্যান্ডে। সরকারের অনুমোদন নিয়ে তিনি গত বছরের শেষ দিকে এবং চলতি বছরের প্রথম দিকে থাইল্যান্ড যান। সেখানে অপারেশন করান। প্রথম দফায় তাঁর সঙ্গে চিকিৎসক ছিলেন। পরের দফায় তাঁর মেয়ে ও তার স্বামী ছিলেন।
খালিদ হোসেন জানান, চিকিৎসার জন্য বার বার যাওয়ার কথা ভাবলেও খরচ বেশি বলে তিনি যেতে পারছেন না। প্রতিবছর লাখ লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসা নিতে বিভিন্ন দেশে যান। মেডিকেল ট্যুরিজমের আওতায় ভারতে ১৫ থেকে ১৭ লাখ বাংলাদেশি যান। যদিও এ পরিসংখ্যান ২০২৪ সালের আগে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি পাল্টালেও রোগীরা চিকিৎসার জন্য দেশটিতে যেতে চান। ভারতের পরেই থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে যান অনেক মানুষ, সেই সংখ্যাও কম নয়।
উপরোক্ত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে খালিদ হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, অতীতের সরকারগুলো ধারাবাহিকভাবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ব্যর্থ কি না। অকপট খালিদ হোসেন বলেন, ‘নিশ্চয়ই ব্যর্থতা রয়েছে। আমরা কেন এত বছরেও একটি ভালো হাসপাতাল করতে পারলাম না। আমরা মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মতো হাসপাতাল করতে পারিনি। ব্যাংকে হাজার কোটি টাকা লুট হয়, পাচার হয়। দেশে চিকিৎসা থাকলে এত খরচ হতো না। চিকিৎসা বাবদ আমার নিজেরও অনেক টাকা খরচ হয়েছে। দেশে চিকিৎসা থাকলে কেউ যাবে? এটা প্রমোদ ভ্রমণ নয়।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্যাবিনেটে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা খালিদ হোসেন পরে জানালেন, উপদেষ্টা পর্ষদের বৈঠকে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি কেন? এর উত্তরে তিনি বলেন, উপদেষ্টা বা মন্ত্রীরা ইচ্ছা করলেই অনেক কিছু করতে পারেন না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। এখানে কিছু করা যায় না।
শুরুতে ১৬ উপদেষ্টা নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পরে আরও কয়েকজন যুক্ত হন। অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসের শাসনামলে তাদের মধ্যে অনেকেই বিদেশে চিকিৎসা বিল নিয়েছেন। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানও রয়েছেন এ তালিকায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। আঠারো মাসে বিদেশে চিকিৎসার জন্য তিনি সরকারি কোষাগার থেকে ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার ২২৯ টাকা বিল নিয়েছেন, যা সর্বোচ্চ ব্যয়ের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। খালিদ হোসেন ৮১ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৮ টাকায় প্রথম অবস্থানে রয়েছেন। বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, ‘আমি খুব সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। একপর্যায়ে শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। দেশে চিকিৎসা চিহ্নিতই করা যাচ্ছিল না। পরে বাধ্য হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়েছি।’ বলেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি সেখানে তিনবার চিকিৎসা নিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছিলেন এই উপদেষ্টা। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা, যা মোট স্বাস্থ্য বাজেটের ০.০০০১৮৯ শতাংশ। প্রতিবছর লাখ লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়েন।
খালিদ হোসেন ও সালেহউদ্দিন আহমেদের বাইরে, তৃতীয় সর্বোচ্চ বিদেশে চিকিৎসা বিল নিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি নিয়েছেন ৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৪৪ টাকা। সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিয়েছেন ৭ লাখ ১৫ হাজার ৬৪৯ টাকা। বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান নিয়েছেন ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৫ টাকা। ভূমি উপদেষ্টা হাসান আরিফ ২ লাখ ৬৭ হাজার ২১৬ টাকা এবং শিক্ষা উপদেষ্টা ড. এম আমিনুল ইসলাম ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭২৯ টাকা নিয়েছেন। খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার ১ লাখ ৭০ হাজার ১৩৪ টাকা পেয়েছেন। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ ৬৭ হাজার ৩৬৭ টাকা এবং শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ৩১ হাজার ৫২ টাকা নিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান ২১ হাজার ৮০০ টাকা পেয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা শেখ মইনউদ্দিন চিকিৎসা বাবদ ৪ হাজার ১৬০ টাকা নিয়েছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, নিয়ম অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী অসুস্থ হলে সরকার তার চিকিৎসার ব্যয় বহন করে। জরুরি প্রয়োজন হলে বিদেশেও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে এটি কোনো মাসিক বা বার্ষিক চিকিৎসা ভাতা নয়।
চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম-কানুন অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক বলে উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, ‘অসুস্থতার প্রমাণ এবং প্রয়োজনীয় বিল-ভাউচার দাখিলের শর্তে সরকার চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধ করে। যদি অর্থ নেওয়া হয়, কিন্তু কোনো বিল-ভাউচার দাখিল না করা হয় তাহলে তা নিয়মবহির্ভূত। পাশাপাশি যারা অর্থ অনুমোদন ও ছাড় করেছেন, তারাও অনিয়মের দায় এড়াতে পারেন না।’
‘বিষয়টির সুনির্দিষ্ট তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। যে সকল ব্যক্তিরা জড়িত তাদের দায় নিরূপণ করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কী প্রক্রিয়ায় অর্থ ছাড় করা হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।’ —যোগ করেন তিনি।
ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য, ‘বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়েও সরকার কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও আবশ্যিকভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত। বিল-ভাউচার ছাড়া কীভাবে অর্থ ছাড় করা হলো, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে।’
সূত্র : আগামীর সময়
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন