প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ শহরে আবারও অবরুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। হুথি যোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা এবং সরকারনিয়ন্ত্রিত এলাকার সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে শহরটিতে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন মানবিক সংকটের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আল জাজিরার একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে হুথিদের অবরোধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এখনো ভুলতে পারেননি তাইজের বাসিন্দারা। ৩৭ বছর বয়সী ইস্কান্দার আবদুল্লাহ জানান, পূর্ববর্তী অবরোধের সময় মানুষকে খাবার, পানীয় জল, জ্বালানি ও ওষুধের মতো মৌলিক প্রয়োজনীয়তার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সেই দুর্দিন যেন আবার ফিরে না আসে।
গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে লোহিত সাগর উপকূলবর্তী তাইজ প্রদেশে হুথিদের অভিযান শুরু হয়। পরে তারা বন্দরনগরী মোখা ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিকটবর্তী ধুবাব এলাকা দখল করে নেয়। বাব আল-মান্দেব প্রণালি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথগুলোর একটি, যেখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ পরিচালিত হয়।
অক্টোবরের শুরুতে সউদী আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান চালিয়ে কিছু হারানো এলাকা পুনর্দখল করে। তবে তাইজ শহরের আশপাশের গ্রামীণ এলাকায় হুথিদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। ৪ অক্টোবরের মধ্যে তারা আল-তুরবাহ শহর দখল করে নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে তাইজ শহরের সঙ্গে সরকারনিয়ন্ত্রিত অন্যান্য এলাকার সংযোগকারী শেষ প্রধান সড়কটিও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
তাইজ প্রদেশের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যালয়ের মহাপরিচালক নাবিল জামিল জানান, এবারের অবরোধ ২০১৫ সালের তুলনায় আরও বিস্তৃত এবং এর প্রভাবও বেশি গুরুতর। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রদেশটির সরকারনিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রায় ২৮ লাখ মানুষ বসবাস করেন। উপকূলীয় ও গ্রামীণ এলাকায় সাম্প্রতিক লড়াইয়ের কারণে আরও প্রায় দুই লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে এসব মানুষের জীবনযাত্রার পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
অবরোধের প্রভাব ইতোমধ্যে শহরের জ্বালানি বাজারে পড়েছে। আল-তুরবাহ হয়ে আদেন থেকে আসা জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সড়কে যানবাহনের চলাচল কমে গেছে। কালোবাজারে ২০ লিটার পেট্রলের দাম ৩০ হাজার ইয়েমেনি রিয়াল থেকে বেড়ে ৯০ হাজার রিয়ালে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ডলারে হিসাব করলে দাম প্রায় ১৯ ডলার থেকে বেড়ে ৫৮ ডলার হয়েছে।
খাদ্যপণ্যের বাজারেও চাপ বাড়ছে। অবরোধের আশঙ্কায় বাসিন্দারা আগাম খাবার কিনে মজুত করছেন। ফলে বাজার ও মুদিদোকানে চাহিদা বেড়েছে। অর্থনীতি বিষয়ে কাজ করা সাংবাদিক ওয়াফিক সালেহ জানান, গম ও আটার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে এবং শাকসবজি ও ফলমূলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, শহরে কয়েক মাস চলার মতো খাদ্য মজুত থাকলেও কিছু ব্যবসায়ী সংঘর্ষ তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।
২০১৬ সালে সরকারি বাহিনী তাইজ শহরের দক্ষিণের কিছু এলাকা পুনর্দখল করার পর অবরোধ ভাঙতে সক্ষম হয়েছিল। ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে হুথিরা শহরের পূর্ব দিকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক খুলে দিতে সম্মত হয়। ওই পথ দিয়ে সানা ও উত্তর ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা যেত। তবে সাম্প্রতিক লড়াই ও হুথি যোদ্ধাদের অনুপ্রবেশের চেষ্টার পর পথটি আবার বন্ধ হয়ে গেছে বলে নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আল জাজিরা।
তাইজে চলমান সংঘাতের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। হুথি-বিষয়ক সাংবাদিক সালমান আল-মাকরামি মনে করেন, শহরটির অবরোধের মাধ্যমে গোষ্ঠীটি তাদের বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে বিভক্তি তৈরি করতে চাইছে। দীর্ঘদিন ধরে তাইজ হুথিবিরোধী মনোভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শহরটি দখল করতে পারলে সরকারনিয়ন্ত্রিত অন্যান্য এলাকাতেও নিজেদের সামরিক প্রভাব বিস্তারের বার্তা দিতে পারবে গোষ্ঠীটি।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে। বিচার ও উন্নয়ন অধিকার সংস্থার প্রধান এবং আইনজীবী নাবিল শারিয়ান বলেন, কোনো সংঘাতেই বেসামরিক মানুষকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা, ওষুধ এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর সুযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। চলাচলে বাধা পড়লে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাইজের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সংকট মোকাবিলায় সহায়তা চেয়ে জাতিসংঘের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে বেসামরিক মানুষের চলাচলের জন্য নিরাপদ সড়ক ও করিডর চালু করা, খাদ্য ও ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখনো তারা জাতিসংঘের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে। তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন