প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চা শ্রমিকদের খাবার দুপুরের ক্লান্তি কাটাতে পাতিচখায় চলে আসে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় তাদের যাত্রা। কারো মাথায় ঝুড়ি, কারো কাঁধে পাতাভর্তি ব্যাগ থাকে।
আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে তাদের গন্তব্য চা-বাগান। চারপাশে সারি সারি সবুজ চা-গাছ দেখা যায়। সেই সবুজের ভেতর কাঁচি হাতে, আঙুলের ফাঁকে কচি পাতা তুলে দিন শুরু হয় চা শ্রমিকদের।
দূর থেকে দৃশ্যটি মনোমুগ্ধকর মনে হয়।
কিন্তু এই সবুজের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে অন্য এক গল্প। সেই গল্প ক্ষুধা, অভাব এবং বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইয়ের।
দুপুর গড়িয়ে এলে চা-বাগানের ব্যস্ততায় কিছুটা ছন্দপতন ঘটে। কাজের ফাঁকে গাছের ছায়ায় বসে পড়েন শ্রমিকরা।
কারো কাছে পলিথিনে করে আনা মুড়ি, কারো পাত্রে পান্তা ভাত থাকে। কেউ সঙ্গে আনেন চালভাজা কিংবা আটার মোটা রুটি। সেই রুটির সঙ্গে থাকে চা-পাতা দিয়ে তৈরি ঝাল এক খাবার—শ্রমিকদের ভাষায় ‘পাতিচখা’ বলে পরিচিত।
চা গাছের কচি পাতা, কাঁচা মরিচ, রসুন-পেঁয়াজ—কখনও কাঁচা, কখনও সামান্য ভেজে প্রস্তুত হয় এই খাবার। অভাবের সংসারে এটি কোনো শখের খাবার নয়; বরং চা শ্রমিকের কাছে এটি দুপুরের ক্ষুধা সামলানোর অন্যতম ভরসা।
চায়ের সবুজ পাতায় মিশে রয়েছে শ্রমিকের জীবনের এমনই এক নির্মম বৈপরীত্য। যে পাতা দেশের অর্থনীতিতে মূল্য যোগ করে, সেই পাতাই ক্লান্ত দুপুরে চা শ্রমিক পরিবারে ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ হয়ে দাঁড়ায়।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী শমশেরনগর ইউনিয়নে অবস্থিত কানিহাটি চা-বাগানে গিয়ে দেখা মেলে এই বাস্তবতার। রবিবার দুপুর ২টার দিকে পাতা ওজন করে গাড়িতে তোলার অপেক্ষায় ছিলেন শ্রমিকরা। ব্যস্ততার মধ্যেই চোখে পড়ে দুপুরে তাদের একসঙ্গে বসে খাবারগ্রহণের দৃশ্য।
চা শ্রমিক গীতা বুনার্জীর সংসারের গল্প যেন পুরো বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। অভাবের সংসারে চাল জোগাড় করাই যখন কঠিন, তখন ডাল কিংবা তরকারি তাদের কাছে প্রায় বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়।
গীতা বুনার্জী জানান, "তাদের ঘরে চাল থাকে না। ডাল বা তরকারি তাদের কাছে বিলাসিতা। দুপুরের খাবারে তাই রুটি বানিয়ে নেন। আর চায়ের কুঁড়ি দিয়ে পাতিচখা বানিয়ে খেয়ে নেন। কখনো কাঁচা পাতা, কখনো ভেজে নেন। এটা দিয়েই তাদের দিন চলে যায়।"
গীতা বুনার্জীর এই কথার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ‘পাতিচখা’র অর্থ।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সপ্তাহের ছয় দিন তাদের কাজে থাকতে হয়। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে বাগানের কাজ। এর পরও দিনের পরিশ্রম শেষ হয় না।
ঘরে ফিরেই অপেক্ষা করে আরেক দফা দায়িত্ব- রান্না করা, পানি সংগ্রহ, সন্তানদের দেখাশোনা, সংসারের কাজ। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য কর্মস্থলের পর ঘরের কাজ হয়ে ওঠে দ্বিতীয় কর্মদিবস।
এক নারী শ্রমিক জানান, "সপ্তাহে ছয় দিনই সকাল ৮টায় কাজে যোগ দেন। ছুটি হয় বিকেল ৫টায়। এরপর ঘরে ফিরে রান্না, পানি আনা, বাচ্চাদের দেখভাল—সব করতে হয়।"
বাগান দূরে হলে ভোরের আগেই ঘর ছাড়তে হয় চা শ্রমিকদের। তাদের অনেকেই কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে কর্মস্থলে পৌঁছান। দিনভর পরিশ্রমের পর হাতে আসে ১৭৮ টাকা। নির্ধারিত পরিমাণ পাতা তুলতে না পারলে মজুরি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই আয়ে সংসারের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য-সবকিছুর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রতিদিনই হিমশিম খেতে হয় তাদের।
সরেজমিন বাগানে গিয়ে দেখা যায়, চা-পাতা তোলার কাজ বাইরে থেকে সহজ ও নান্দনিক মনে হলেও বাস্তবে তা অনেক কঠিন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামনে ঝুঁকে কাজ করতে হয়। গরম, বৃষ্টি, কাদা কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া-কিছুই তাদের শ্রম থামাতে পারে না।
শ্রমিকদের কেউ কেউ জানান, "দীর্ঘসময় ধরে কাজ করার কারণে পা ফুলে যায়। হাতে পড়ে কড়া, কখনও চামড়া উঠে যায়, তবু বিশ্রামের সুযোগ নেই। কারণ একদিন কাজ বন্ধ মানেই একদিনের আয় বন্ধ। আর আয় কমে গেলে কমে যায় পরিবারের খাবারের পরিমাণও।"
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌলভীবাজারে রয়েছে ৯২টি চা-বাগান। দেশের চা উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। চা শিল্পের পাশাপাশি পর্যটনের জন্যও এ জেলার রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। পাহাড়, টিলা আর বিস্তীর্ণ চা-বাগানের সবুজে মুগ্ধ হন দেশ-বিদেশের পর্যটক।
কিন্তু সেই সবুজ সৌন্দর্যের আড়ালেই বসবাস করেন এমন মানুষ, যাদের জীবন বাস্তবতায় অনেকটাই বিবর্ণ।
শত বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে চা শিল্পের বিকাশ ঘটলেও এই শিল্পের অন্যতম প্রধান শক্তি চা শ্রমিকদের জীবনমান এখনও কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অনেক শ্রমিকের বসতঘর পুরনো ও জরাজীর্ণ। স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল। স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত। শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও শিক্ষার মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা-বাগানকেন্দ্রিক জীবনে বেড়ে ওঠা মানুষের বড় একটি অংশ এখনও দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও নানা সামাজিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, "প্রশাসনের পক্ষ থেকে চা শ্রমিকদের পাশে থাকার চেষ্টা করা হচ্ছে। কেউ অসুস্থ হলে খোঁজ নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি উপজেলার ১২ হাজার ৫৯২ জন চা শ্রমিককে প্রতিমাসে ৬৫০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। এটি বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। শিগগির বর্ধিত অর্থ পাবেন তারা।"
ইউএনও বলেন, "চা-বাগানে পাতা তোলার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের স্যানিটেশনের প্রয়োজন হয়, কিন্তু অনেক জায়গায় সেটি নেই। তাদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পুষ্টির বিষয়েও বাগান ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।"
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন