প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মার্কিন টেলিভিশন সিরিজ ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এ ওয়াল্টার হোয়াইটের বিদ্রোহী ছেলে ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি অর্জন করা অভিনেতা আরজে মিট মারা গেছেন। তাঁর বয়স ছিল ৩৪ বছর।
অভিনেতার প্রতিনিধি বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রিয় অভিনেতা, জনহিতৈষী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার কর্মী আরজে মিটের মর্মান্তিক প্রয়াণে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।’
টেক্সাসের ব্রাউনসভিলে তাঁর মৃত্যু ঘটেছে। তবে মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। উল্লেখ্য, আরজে মিট নিজেও সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত ছিলেন। নিজের শারীরিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ‘ব্রেকিং ব্যাড’ সিরিজে ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র চরিত্রে অভিনয় করেন। ব্রায়ান ক্র্যানস্টন ও অ্যারন পলের সঙ্গে অভিনয় করা এই সিরিজের জন্য ২০১৪ সালে স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ডও লাভ করেন তিনি।
অভিনেতার প্রতিনিধি শন রেইলি বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, ‘মিট চরিত্রটিতে বাস্তবতার ছাপ এনেছিলেন। পাশাপাশি প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তির পক্ষে কাজ করার একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন তিনি।’
মিট ইউনাইটেড সেরিব্রাল পালসি এবং শ্রাইনার্স চিলড্রেনসের দূত হিসেবেও কাজ করেছেন। এছাড়া জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগকে সহায়তা দিতে তিনি ‘দ্য মিট ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রতিনিধি জানান, নিজের পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং তাঁদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য কাজ করতেন এই অভিনেতা।
ব্রাউনসভিল পুলিশ বিভাগ বিবিসিকে জানিয়েছে, অভিনেতার মৃত্যুর কারণ ও ধরন এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা সন্দেহ করা হচ্ছে না।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে ক্যামেরন কাউন্টির জাস্টিস অব দ্য পিস সিন্ডি হিনোজোসা জানান, ১২ অক্টোবর নিজের বাড়ি বলে ধারণা করা হচ্ছে- এমন একটি স্থানে মিটকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তাঁর মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্ত করা হবে।
‘ব্রেকিং ব্যাড’ ও ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল এএমসিতে পাঁচ মৌসুম প্রচারিত হয় ‘ব্রেকিং ব্যাড’। ভিন্স গিলিগান নির্মিত অপরাধনির্ভর এই সিরিজটি ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে। প্রাইমটাইম এমি অ্যাওয়ার্ডে সিরিজটি ৫৮টি মনোনয়ন পায়, যার মধ্যে ১৬টি পুরস্কার জিতে নেয়। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে সেরা ড্রামা সিরিজ বিভাগেও পুরস্কার পায় এটি।
সিরিজে ব্রায়ান ক্র্যানস্টন অভিনয় করেন নিউ মেক্সিকোর এক উচ্চবিদ্যালয়ের রসায়নের শিক্ষক ওয়াল্টার হোয়াইট চরিত্রে। ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়েন। মেথামফেটামিনের অবৈধ ব্যবসায় যত গভীরভাবে প্রবেশ করতে থাকেন, ততই ছেলের কাছ থেকে দূরে সরে যান তিনি। সিরিজের বিভিন্ন পর্বে ওয়াল্টার জুনিয়র রসিকতার মাধ্যমে বাবার কর্মকাণ্ডের প্রতি নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করে।
মিটের মৃত্যুর খবরে শোক প্রকাশ করেছেন তাঁর পর্দার বাবা ব্রায়ান ক্র্যানস্টন। ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, এই খবর তাঁকে ‘গভীর হতাশা ও শোকে’ ডুবিয়ে দিয়েছে।
ক্র্যানস্টন বলেন, ‘ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র চরিত্রে অভিনয়ের জন্য যখন তাকে নেওয়া হয়, তখন তার বয়স মাত্র ১৪ বছর। চরিত্রটিতে সে আনন্দ ও উৎসাহ নিয়ে অভিনয় করেছিল।’
তিনি আরও লেখেন, ‘২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন আমরা পাইলট পর্বের শুটিং শুরু করি, তখন ছেলেটি অভিনয়ে বেশ কাঁচা ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা তাকে একজন সত্যিকারের ভালো অভিনেতা হয়ে উঠতে দেখেছি।’
মিটের প্রতিবন্ধী অভিনয়শিল্পীদের অধিকার নিয়ে কাজের কথাও স্মরণ করেন ক্র্যানস্টন। তাঁর ভাষ্য, নিজের সেরিব্রাল পালসিকে কখনোই কোনো কিছুর অজুহাত হতে দেননি মিট।
‘এত সম্ভাবনা, এত প্রতিভা—সবকিছু এভাবে হারিয়ে যাওয়া সত্যিই বড় ক্ষতি,’ লেখেন ক্র্যানস্টন। ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর শুটিং চলাকালে এবং সিরিজটির জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পরও মিটের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগত তাঁর।
শেষে পর্দার ছেলেকে উদ্দেশ করে ক্র্যানস্টন লেখেন, ‘তোমাকে খুব মিস করব, ছেলে।’
সিরিজে জেসি পিংকম্যান চরিত্রে অভিনয় করা অ্যারন পলও শোক প্রকাশ করেছেন। হলিউড রিপোর্টারকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আরজে, বন্ধু, তোমাকে আমি ভালোবাসি। তোমাকে মিস করব। আর যাঁরা এই কথাগুলো পড়ছেন, তাঁদের বলছি-জেনে রাখুন, আপনাদের ভালোবাসা হয় এবং আপনারা একা নন। সব সময় এটা মনে রাখবেন।’
মিটের পর্দার চাচা হ্যাঙ্ক শ্রেডার চরিত্রে অভিনয় করা ডিন নরিসও তাঁকে স্মরণ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আরজে আমার টেলিভিশনের ছেলে ছিল না, তবে সেটে ছোটবেলা থেকেই আমি সব সময় তার খেয়াল রাখতাম। সে ছিল অসাধারণ মনের একজন তরুণ। তাকে ভীষণ মিস করা হবে।’
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে কাজ লুইজিয়ানায় বেড়ে ওঠা মিট ২০০৫ সালে ছোট বোনের অভিনয়জীবনে সহায়তা করতে লস অ্যাঞ্জেলেসে যান। তখন তাঁর বয়স ছিল কৈশোরের শুরুর দিকে। সেখানেই ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এ অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি।
লস অ্যাঞ্জেলেসে তাঁর প্রথম অডিশন ছিল মেথামফেটামিনবিরোধী একটি জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনের জন্য। চলতি মাসের শুরুতে জো ভলপিস পডকাস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মিট বলেছিলেন, ‘এরপর “ব্রেকিং ব্যাড”-এর অডিশনে অংশ নিই। আমার মতে, এটিও মাদকবিরোধী একটি কাজ, কারণ শেষ পর্যন্ত এতে কারও পরিণতি ভালো হয় না।’
সিরিজের ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র চরিত্রটি নির্মিত হয়েছিল নির্মাতা ভিন্স গিলিগানের প্রয়াত এক বন্ধুর আদলে। ওই ব্যক্তির সেরিব্রাল পালসি ছিল আরও গুরুতর এবং তিনি চলাফেরার জন্য হাতের বাহুতে ভর দিয়ে ব্যবহৃত ক্রাচ ব্যবহার করতেন। তবে মিটের সেগুলোর প্রয়োজন হতো না।
নিজের শারীরিক অবস্থার বিষয়টি সিরিজে আলাদা করে উল্লেখ না করেও চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন মিট। কিশোর ওয়াল্টার জুনিয়রের রসবোধ ও স্বাভাবিক আচরণ দর্শকের কাছে চরিত্রটিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়ার পর মিট প্রতিবন্ধী অভিনয়শিল্পীদের জন্য আরও বৈচিত্র্যময় চরিত্র এবং জটিল ও বাস্তবসম্মত উপস্থাপনার দাবি জানাতে থাকেন। দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্য-সব ধরনের প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রেই প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে কাজ করেন তিনি।
২০২১ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিট বলেছিলেন, ‘পুরস্কারের মৌসুম এলে আমরা সব সময় এমন বৈচিত্র্যময় কাজ দেখতে চাই, যা শারীরিক ও মানসিক-সব দিক থেকেই আমাদের সবার প্রতিনিধিত্ব করে।’
তিনি আরও বলেছিলেন, ‘প্রতিবন্ধিতা নিয়ে সচেতনতা বাড়তে দেখা দারুণ ব্যাপার। তবে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কখনো কখনো বড় ধরনের রূপান্তরের বদলে ছোট ছোট অগ্রগতি ও বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের মধ্য দিয়েই সাফল্য আসে।’
‘ব্রেকিং ব্যাড’ ছাড়াও ‘হান্না মন্টানা’, ‘সুইচড অ্যাট বার্থ’ ও ‘ওয়েস্টহ্যাম্পটন’-এর মতো টেলিভিশন প্রযোজনায় অভিনয় করেছেন মিট। এ বছরের শুরুর দিকে মুক্তি পাওয়া ‘টকিং টু স্ট্রেঞ্জার্স’ ছিল তাঁর সাম্প্রতিক কাজগুলোর একটি।
বিবিসি অবলম্বনে
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন