প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে অবস্থিত হাজী মাজার বস্তি একটি পরিচিত পাইকারি মাদকের বাজার হিসেবে পরিচিত। এই এলাকায় পুলিশ সদস্য সংখ্যা বড় না হলে দিনের বেলায় মাদক কারবারিদের জন্য ঢুকতে সাহস পায় না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রাতের বেলায় সম্মিলিত অভিযান ছাড়া পুলিশ বা মাদক সংশ্লিষ্ট নয়—এমন কেউ হাজী মাজার বস্তিতে প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে প্রবেশ করতে চাইলে মাদক কারবারিদের অনুমতি মোবাইল ফোনে নিতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা জানান, রাতের বেলায় বস্তির চারপাশে মাদক কারবারিরা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় পুলিশের মতো ওয়াকিটকি ও সিসি ক্যামেরা দিয়ে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত ২৭ অক্টোবর রাতে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) ‘হাজী মাজার বস্তি থেকে তুরাগ নদে ঝাঁপ দেওয়ার’ ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
হাজী মাজার বস্তি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত মূল মহাসড়ক থেকে ৫০০ গজ ব্যবধানে মাজার রোড ও হোন্ডা রোড দিয়ে বস্তিতে প্রবেশ করা যায়।
মাজার বস্তির দুই দিকে এই দুটি সড়ক রয়েছে। বাকি দুই দিকে তুরাগ নদ। দুই সড়কের প্রবেশদ্বারে মাদক কারবারিরা কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। প্রবেশমুখে পাহারা বসিয়ে ওয়াকিটকির মাধ্যমে মাদকের এই বাজার চলছে অনেকটাই নিরাপদে।
কয়েক বছর আগে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার একটি দলের ওপর হামলা করে মাদক কারবারিরা, যার ফলে পরিদর্শকসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। গত ২৬ অক্টোবর স্থানীয় এক সাংবাদিককে দিনের বেলায় অপহরণ করে মাজার বস্তিতে নিয়ে গিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয় এবং দুই ঘণ্টা ধরে নির্যাতনের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সাংবাদিক এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ওই ঘটনায় থানায় মামলা হলে পুলিশ মাজার বস্তি থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করে। সাংবাদিককে নির্যাতনের পরদিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাতে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি ও তার ‘জুনিয়র বন্ধু’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ মাজার বস্তির পাশে তুরাগ নদের তীরে ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের কাছে এসেছিলেন বলে তথ্য বেরিয়েছে।
দীপের তথ্য ও পুলিশের সংগ্রহ করা মাজার বস্তির বিভিন্ন সিসি টিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর রাত ১২টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে মাজার সড়ক দিয়ে বস্তির ভেতর প্রবেশ করেন সাউরি ও দীপ।
আরেকটি ফুটেজে দেখা যায়, প্রত্যেকটিতে দুজন করে আরোহী থাকা তিনটি মোটরসাইকেল একযোগে মাজার বস্তিতে প্রবেশ করে। এর মধ্যে প্রথম মোটরসাইকেলে সাউরিকে দেখা যায়।
এরপর শুক্রবার ভোররাতে মাজার রোড থেকে কোয়ার্টার কিলোমিটার দূরে হোন্ডা রোডে একটি মোটরসাইকেল পায় টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশ।
মোটরসাইকেল উদ্ধারকারী টঙ্গী পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এখলাছ উদ্দিন ফরাজী কালের কণ্ঠকে জানান, সেনাকল্যাণ এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ভোররাত ৩টা ১০ মিনিটে স্থানীয় লোকজন জানায়, দুই দিন ধরে ওই এলাকায় একটি মোটরসাইকেল পড়ে ছিল। ওই তথ্যের ভিত্তিতে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়।
মোটরসাইকেলটিতে ধুলোবালি ছিল। শুধু স্টার্টিং লক করা নম্বর প্লেটবিহীন গাড়িটি ছিল পরিত্যক্ত অবস্থায়। মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পিবিআই মোটরসাইকেলটি জব্দ করে।
প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি (২৮) রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হন। ওই দিন দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে মুঠোফোনে বার্তা (ভয়েস মেসেজ) পাঠিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, বাসায় ফিরছেন, কিন্তু আর ফেরেননি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর উত্তর খানের তুরাগ নদের রাজবাড়ী ঘাট থেকে সাউরির লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় সাউরির ‘জুনিয়র বন্ধু’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে টঙ্গী থেকে দুই বন্ধুকে বহনকারী মোটরসাইকেলটি উদ্ধারের পর দীপকে নিয়ে পিবিআই টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তির তুরাগ তীর পরিদর্শন করে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনাস্থলে তাদের কয়েকজন ধাওয়া করলে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। আর পালিয়ে আসেন তিনি (দীপ)। তবে কারা তাদের ধাওয়া করেছিল, কেন করেছিল এবং নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর তাহসিফের কী হয়েছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়। পরে উত্তরখান থানায় মামলা হলে পিবিআই দীপকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। ওই ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ দীপকে রিমান্ডে নেয়।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, তুরাগ নদঘেঁষা এবং ঢাকা ও গাজীপুরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হাজী মাজার বস্তি ও এর আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা, ছিনতাই ও অপরাধী চক্রের ব্যাপক তৎপরতা রয়েছে। নির্জন পথ, নদীতীরবর্তী অবস্থান এবং অপরাধীদের প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
এলাকাটিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও নজরদারি কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সূত্র জানায়, তাহসিফকে দীপ কেন ওই এলাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে তাদের যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, তারা মাদক কারবারিদের ধাওয়ার মুখে পড়েছিলেন, নাকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অন্য কোনো পক্ষের তাড়া খেয়েছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
মোটরসাইকেলটি কার—তা শনাক্ত এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে অনেকের অভিমত।
একজন সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্টের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে মাজার বস্তির নাম উঠে আসায় এলাকাটির অপরাধ পরিস্থিতি, মাদক কারবারিদের নেটওয়ার্ক এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
শুধু তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন নয়, জননিরাপত্তার স্বার্থে এই এলাকার অপরাধী চক্রের প্রকৃত অবস্থান ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদেরও শনাক্ত করা জরুরি বলে মনে করছে এলাকাবাসী।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন