প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দিনাজপুর, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ : চলতি বছর অনুকূল আবহাওয়া ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার করে জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের ফলন অর্জিত হয়েছে।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (প্রশিক্ষণ) মো. মোস্তাফিজুর রহমান গতকাল বুধবার এই তথ্য বাসসকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, কৃষি বিভাগ চলতি বছর জেলায় ৯ হাজার ৯শ’ হেক্টর জমিতে আউস ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। অনুকূল আবহাওয়া এবং মাঠ কর্মকর্তাদের সঠিক পরামর্শ, পাশাপাশি নিবিড় পরিচর্যায় কৃষকরা অতিরিক্ত ১২ হেক্টর জমিতে আউস ধান চাষ করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে, জেলার ১৩টি উপজেলায় মোট ৯ হাজার ৯১২ হেক্টর জমিতে আউস ধান চাষ সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিগত সময়ে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া আউশ ধান চাষে কৃষকদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে কৃষি বিভাগের উদ্যোগ সফল হয়েছে।
উপ-পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গত দু’বছর আগে কৃষি বিভাগের গবেষণায় উদ্ভাবিত উন্নত জাত ও উচ্চ ফলনশীল ব্রি-৯৮ আউশ ধান চাষে জেলায় অধিক ফলন হয়েছে। চলতি মৌসুমে ১৩টি উপজেলায় ৯ হাজার ৯শ’ হেক্টর জমিতে আউস ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। মৌসুমের শুরুতে, গত মে মাসে, ১৩টি উপজেলায় ৭ হাজার ৩৫০ জন কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে ব্রি-৯৮ জাতের বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বিতরণ করা হয়েছিল।
আউশ ধান চাষে সফলতা অর্জনের জন্য জেলার ১৩টি উপজেলার কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মকর্তাগণ কৃষকদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা প্রদান করেছেন, যার ফলে আউশ ধান চাষে সফলতা এসেছে বলে কৃষি বিভাগ জানায়।
জেলার সদর উপজেলার চেহেলগাজী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম জানান, কর্ণাই ও নশিপুর দু'টি গ্রামে সমবায় ভিত্তিতে কৃষকরা এবার আউশ ধানের ব্রি ধান-৯৮ জাতের চাষ করেছেন। আউশ ধান চাষের সাড়ে ৩ মাসের মধ্যে কৃষকরা ফসল ঘরে তুলতে পেরে খুব খুশি।
তিনি জানান, এক একর জমিতে ৭৫ থেকে ৮০ মণ ধানের ফলন হয়েছে। কৃষি বিভাগের বিনামূল্যে দেয়া বীজ, সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে অনাবাদি জমি অধিক উৎপাদনশীল হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বাজারে কাঁচা ধান এক হাজার ৫০ থেকে ১১শ’ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। আউস ধানের খড় বিক্রি করে বাড়তি টাকা পাওয়া যাচ্ছে। ফলে, ধান বিক্রির পাশাপাশি খড় বিক্রিতেও কৃষকরা তাদের খরচের একটি অংশ উঠাতে পারছেন।
জেলার বিরল উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামের আদর্শ কৃষক মো. খাদেমুল ইসলাম (৪৫) জানান, ‘চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে জমিতে বীজতলা তৈরি করে ব্রি-৯৮ জাতের আউশ ধান চারা রোপণ করেছি। কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরামর্শে সেচ, সার ও কীটনাশক ব্যবহারে বেশ ভাল ফলন হয়েছে। ভাদ্র-আশ্বিনের এই সময়ে মাঠজুড়ে আউশ ধানের সোনালি শোভা কৃষকদের মন ভরে তুলেছে। কৃষকেরা তাদের অর্জিত ধান কাটা-মাড়াই শুরু করেছেন।
আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই ধান কাটা শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ধান কাটার পর কৃষকরা আবার ওই জমিতে আগাম জাতের আলু চাষের প্রস্তুতি শুরু করবেন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় কৃষকেরা আউশ ধান ঘরে তুলে, একই জমিতে আলু চাষ করার পরিকল্পনা করেছেন।
জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার বিন্যাকুড়ি ও ভিয়াইল গ্রামের কৃষকরা বলছেন, নতুন জাতের উন্নত ফলনশীল আউশ ধান চাষে তাদের সাফলতা এসেছে।
বিন্যাকুড়ি গ্রামের কৃষক মো. আব্দুর রহমান (৪৮) জানান, এ বছর তিনি ৭৮ শতক জমিতে আউশ ধান চাষ করেছেন। তার অর্জিত জমি থেকে ৬৭ মণ আউশ ধান পেয়েছেন। ওই ধান বিক্রি করে তিনি আগাম জাতের আলুর চাষ করবেন। আগামী বছর এ জাতের আউশ ধান বেশি করে আবাদ করার আশা করছেন প্রায় এলাকার সব কৃষকরা।
দিনাজপুর সদর উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন বাসস’কে বলেন, এ অঞ্চলের জমি একটু উচুঁ এবং লালমাটি হওয়ায় আগে শুধু রবি শস্যে চাষ করা হতো। এখানে আমন বা ইরি-বোরো ধান চাষ করা হতো না। সরকারি উদ্যোগে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে উন্নত জাতের আউশ ধান চাষ শুরু করা হয়েছে। এখন সেই জমিতেই ৩টি করে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করে কৃষকদের ফসল উৎপাদনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায়, কৃষকেরা বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন।
সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রাকিবুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, চলতি মৌসুমে সদর উপজেলা ৯৭২ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের অধিক উৎপাদন হয়েছে। প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া উন্নত জাতের আউশ ধান চাষে কৃষকরা স্বল্প সময়ে ভালো ফলন পেয়েছেন। আগামীতে আরো অধিক কৃষক আউশ ধান চাষে আগ্রহী হয়ে উঠবেন, সে বিষয় কৃষি বিভাগ কাজ করছে বলে তিনি ব্যক্ত করেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আফজাল হোসেন বাসসকে জানান, তিনি গত কয়েক দিন জেলার প্রায় প্রত্যেকটি উপজেলায় উন্নত জাতের ব্রি-৯৮ আউস ধানের অর্জিত ধান ক্ষেত সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। কৃষকের অর্জিত ধান ক্ষেতের অধিক ফলন দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। সেই সাথে কৃষি বিভাগের উদ্ভাবন করা উন্নত জাতের আউস ধান চাষে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে, এটি একটি ভালো লক্ষণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, গত বছর এ জেলায় কৃষি বিভাগ থেকে আউশ ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে। গত বছর সরকারি ভাবে কৃষকদের কৃষি প্রণোদনা দিয়ে ৫ হাজার ৩৭০ হেক্টর জমিতে আউশ ধান চাষ অর্জিত হয়েছিল। চলতি বছর গত বছরের তুলনায় ৪ হাজার ৫৪২ হেক্টর জমিতে অতিরিক্ত আউস ধান চাষ অর্জিত করা সম্ভব হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ দাবি করছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন