প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
শিক্ষকতা, নাট্যচর্চা, মুকাভিনয়, আবৃত্তি, উপস্থাপনা ও সমাজসেবায় বহুমাত্রিক অবদান রেখে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন অধ্যক্ষ মো. শহীদুল্লাহ খান, যিনি শহীদ খান নামে পরিচিত। মুক্তচিন্তা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ এই ব্যক্তিত্ব সুসং দুর্গাপুর তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গনের এক পরিচিত নাম।
দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষক হিসেবে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পথ দেখানোর পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন তিনি। সংগঠন গড়ে তোলা, নাটক রচনা ও নির্দেশনা, মুকাভিনয়, সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মতো নানা ক্ষেত্রে তাঁর অবদান রয়েছে। তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে।
নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার ঝাঞ্জাইল গ্রামের সন্তান শহীদ খানের বাবা আব্দুস সাত্তার খান কাকৈরগড়া ইউনিয়ন পরিষদের দুবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর মা জোবেদা আক্তার খাতুন খোর্শেদা। স্ত্রী রওশন আরা বেগম একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। তাঁদের তিন সন্তান—কন্যা লাইলা আঞ্জুমান খান স্বর্ণা, কন্যা আসমা আঞ্জুমান খান তুলি এবং ছেলে অমিত খান অমিত। ছেলে অমিত খান ৪৫তম বিসিএসে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, শিক্ষকতায় দীর্ঘ পথচলা
শহীদ খান ১৯৭২ সালে এন জারিয়া ঝাঞ্জাইল হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৬ সালে গৌরীপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৮০ সালে সমাজকল্যাণ বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) এবং একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া কলেজে সমাজকল্যাণ বিষয়ে অধ্যাপনা করেন তিনি। এরপর ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পূর্বধলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। শিক্ষা ও সমাজসেবাবিষয়ক বিভিন্ন সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামেও অংশ নিয়েছেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনে উপস্থাপনা, অভিনয় ও মুকাভিনয়
শহীদ খানের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা ছাত্রজীবনেই। ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা, অভিনয় ও গ্রন্থনার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ‘নবকল্লোল’, ‘জন পরিক্রমা’ ও ‘ইউনিভার্সিটি ম্যাগাজিন পরিচয়’সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা জানা যায়। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘প্রকৃতি ও প্রত্যয়’ অনুষ্ঠানের গ্রন্থনা ও উপস্থাপনাতেও ভূমিকা রাখেন তিনি।
মুকাভিনয় শিল্পী হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে শুরু করে ময়মনসিংহ টাউন হল, গৌরীপুর পাবলিক হল, শম্ভুগঞ্জ হাইস্কুল মাঠ, জারিয়া টি অ্যান্ড টি মাঠ এবং ঝাঞ্জাইল ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে একক মুকাভিনয় পরিবেশন করেছেন তিনি। ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহ টাউন হলে যাত্রিক নাট্যগোষ্ঠীর প্রযোজনায় মুকাভিনয় পরিবেশন তাঁর সাংস্কৃতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
নাট্যনির্দেশনা, মঞ্চসজ্জা, আলোকসম্পাদনা, আবৃত্তি ও অভিনয়েও তাঁর দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। জাতীয় শিল্পকলা একাডেমি প্রযোজিত ‘যদি আর বাঁশি না বাজে’ গীতিনাট্যে নেপথ্য কণ্ঠ দিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান, গীতিনাট্য ও বিজ্ঞাপনে নেপথ্য কণ্ঠদান করেছেন তিনি।
‘কোন এক কুদ্দুস’ নাটকে বিশেষ পরিচিতি
নাটক রচনা ও মঞ্চায়নে শহীদ খানের রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। তাঁর রচিত নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘ন্যায় ন্যায্য’, ‘চেয়ারম্যান সাবের আপ্যায়ন’, ‘ডাকু মনসুর’, ‘ন্যায়ের পরিণাম’, ‘নিঃস্ব যারা’, ‘অপারেশন কাকনপুর’, ‘ফুলবাড়িয়ার বাসযাত্রী’, ‘ফুলবাড়িয়ার ফুলবানু’, ‘খাদ্যবিতরণের ক্যারিকেচার’ ও ‘কোন এক কুদ্দুস’।
১৯৯৫ সালে রচিত ‘কোন এক কুদ্দুস’ নাটকটি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুসকে কেন্দ্র করে নির্মিত প্যাকেজ নাটক হিসেবে উল্লেখযোগ্য। বৃহত্তর ময়মনসিংহের নাট্যচর্চার ইতিহাসে নাটকটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ ও ‘মুসলমানীর গল্প’ এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘জিনের বাদশা’ অবলম্বনে নাট্যরূপ ও মঞ্চায়নের কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন নাট্যসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে নির্দেশনা, মঞ্চসজ্জা ও আলোকসম্পাদনায় অবদান রাখেন।
সংগঠন গঠন ও সমাজসেবায় ভূমিকা
শহীদ খানের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের শুরু ১৯৭২ সালে ঝাঞ্জাইলের মালঞ্চ সংসদের মাধ্যমে। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এই সংগঠনের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এলাকার তরুণ ও কিশোরদের দেশপ্রেম, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক চর্চায় উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেন তিনি। পাশাপাশি হাটবাজার পরিচ্ছন্ন রাখা, চুরি-রাহাজানি প্রতিরোধ এবং সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।
নাট্যসংগঠন সন্ধ্যানী, মালঞ্চ, বহুরূপী নাট্য সংস্থা, গৌরীপুর কলেজ নাট্য সংসদ, বহুবচন, নাট্যচক্র, যাত্রিক নাট্যগোষ্ঠী ও অক্ষর নাট্য সংস্থাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। এসব সংগঠনের মাধ্যমে নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে ভূমিকা রাখেন তিনি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব নিয়েও কাজ করেছেন। ময়মনসিংহের সানকিপাড়ায় রিকশাচালকদের সংগঠিত ও উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগেও তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় অবদান
নিজ এলাকার শিক্ষা বিস্তারে শহীদ খানের উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর একক প্রচেষ্টায় ঝাঞ্জাইল টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় বলে উল্লেখ রয়েছে। ঝাঞ্জাইল হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায়ও তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। এ ছাড়া চেয়ারম্যান বাড়ি জামে মসজিদের জন্য জমিদান ও প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজসেবাকে একসূত্রে গেঁথে কাজ করার মধ্য দিয়ে শহীদ খান নিজের কর্মপরিধিকে বিস্তৃত করেছেন। তাঁর জীবন ও কর্মের নানা দিক নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা গেলে স্থানীয় ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সমাজ গঠনে নিবেদিত মানুষের অবদান সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হবে।
মুক্তচিন্তা, সৃজনশীলতা, অধ্যবসায় ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাকে ধারণ করে চলা এই ব্যক্তিত্বের কর্মজীবন তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টারও এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন