প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রেলওয়ের চাকা ঘুরছে ‘জোড়াতালি’ পদ্ধতিতে। স্বাধীনতার আগে ১৯৬৯ সালে যেখানে রেলের বহরে সচল ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) ছিল ৪৮৬টি, বিগত সাড়ে পাঁচ দশক পরে এখন সেটি কমে গিয়েছে মাত্র ২৬৫টিতে। অর্থাৎ, বর্তমান সংখ্যা অর্ধেকের কাছাকাছি চলে এসেছে। অথচ এই সময়ে ট্রেনের সংখ্যা ও যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। এর পাশাপাশি সচল ইঞ্জিনের ৬৬ শতাংশের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল বা মেয়াদ পেরিয়ে গেছে বহু আগে। চরম এই ইঞ্জিন সংকটের মাশুল সাধারণ যাত্রীদের দিতে হচ্ছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে শিডিউল বিপর্যয় ও দুর্ঘটনা, যার ফলে ট্রেনের গতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত নতুন ইঞ্জিন কেনা না হলে অচিরেই দেশের সার্বিক রেল ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে।
গত ১৪ জুনের দৃশ্যপটটি বাংলাদেশের রেল খাতের বর্তমান জরাজীর্ণ অবস্থার সত্যিকারের প্রতিফলন। ওই দিন উত্তরবঙ্গের ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’, ‘বুড়িমারী এক্সপ্রেস’, ‘একতা এক্সপ্রেস’ ও ‘রাজশাহী এক্সপ্রেস’ নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিলম্বে যাত্রা করেছে। পূর্বাঞ্চলের ‘চট্টলা’ ও ‘উপকূল এক্সপ্রেস’ও তীব্র শিডিউল বিপর্যয়ে পড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশনে অপেক্ষা করতে গিয়ে হাজারো যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
কমলাপুর স্টেশনে অপেক্ষা করা এক ক্ষুব্ধ যাত্রী বলেন, ‘তিন ঘণ্টা ধরে বসে আছি, ট্রেনের কোনো খবর নেই। কখন আসবে তা-ও কেউ বলতে পারছে না।’ রংপুর থেকে আসা আরেক যাত্রী জানান, মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা পৌঁছাতে তার সময় লেগেছে সাড়ে ১৬ ঘণ্টা! প্রতিদিনের এই ভোগান্তি এখন যাত্রীদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিডিউল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানের সময় মূল খলনায়ক হিসেবে উঠে এসেছে ইঞ্জিন সংকট। কমলাপুর রেলস্টেশনের ম্যানেজার কবীর উদ্দীন অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘মিটার গেজ ইঞ্জিনের তীব্র সংকটের কারণে ট্রেনগুলোর শিডিউল ধরে রাখা আমাদের জন্য চরম কষ্টকর হয়ে পড়েছে।’
রেলের কর্মশালাগুলোতে গেলে দেখা যায় একটি করুণ দৃশ্যের অবতারনা। ৫০-৬০ বছরের পুরোনো ইঞ্জিনগুলো মেরামত করে কোনোক্রমে লাইনে ধরে রাখা হচ্ছে। মেকানিকরা জানিয়েছেন, এত পুরোনো ইঞ্জিনের আসল যন্ত্রপাতি (স্পেয়ার পার্টস) বর্তমানে আর বাজারে পাওয়াই যায় না। ফলে একটি নষ্ট ইঞ্জিন থেকে পার্টস খুলে অন্য ইঞ্জিনে লাগিয়ে, অর্থাৎ ‘জোড়াতালি’ দিয়ে ট্রেন সচল রাখা হচ্ছে।
এক ট্রেন চালক (লোকোমাস্টার) আক্ষেপ করে বলেন, ‘৫০-৬০ বছর ধরে একই ইঞ্জিন চালাতে হচ্ছে। কখন যে মাঝপথে বিকল হয়ে যায়, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রেল খাতকে বছরের পর বছর অবহেলা করার মাশুল এখন দিতে হচ্ছে। এর ফলে রেল কেবল বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং এটি পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যোগাযোগ ও রেল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেছেন, ‘বাণিজ্যিকভাবে তো রেল এরই মধ্যে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়বে এবং যাত্রীসেবা সম্পূর্ণ বিঘ্নিত হবে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে পুরো রেল পরিচালনা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
এখন, এই সংকটের মেঘের মাঝে কিছুটা আশাব্যঞ্জক খবর এসেছে সড়ক পরিবহন ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবের পক্ষ থেকে। তিনি বলেন, দ্রুতই এই সংকট কাটানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আপাতত ৩০টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) পাইপলাইনে আছে। আগামী ৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে এগুলো আমাদের রেল বহরে যুক্ত হবে। এছাড়া নতুন কিছু পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে আগামী দুই বছরের মধ্যে আমরা একটি মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে সক্ষম হব।’
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে বর্তমানে ৬টি আলাদা প্রকল্পের আওতায় মোট ১৬৬টি নতুন ইঞ্জিন কেনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। যদিও সাধারণ যাত্রী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিকল্পনাগুলো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়িত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন