প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
শৈশবের দিনগুলো মুম্বাইয়ের বস্তিতে কাটিয়েছিল। বিদ্যালয়ের ক্যানটিনে সমুচা কেনার জন্য প্রয়োজনীয় টাকাও ছিল না। সেই বস্তির ছেলে রিজওয়ান সাজান এখন দুবাইভিত্তিক নির্মাণসামগ্রী ও রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের মালিক। তিনি ড্যানিউব গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সফল ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচিত।
রিজওয়ানের দুবাইয়ে রয়েছে ৪০ হাজার বর্গফুটের একটি প্রাসাদ। সেখানে একটি বিশাল ফোয়ারা, ব্যক্তিগত সিনেমা হল, ক্যাসিনো-স্টাইল গেমিং লাউঞ্জ, সুইমিংপুল, স্পা রয়েছে। এমনকি ঘরের ভিতরে খাবার ওঠানামার জন্য আলাদা একটি লিফটও অবস্থিত।
নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় রিয়েলিটি সিরিজ ‘দুবাই ব্লিং’-এ তার উপস্থিতি নতুন প্রজন্মের কাছে তাকে আরও পরিচিত করে তুলেছে। তবে ক্যামেরার ঝলকানি, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং হাজার কোটির সম্পত্তির আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে সংগ্রাম, ঝুঁকি ও অবিশ্বাস্য অধ্যবসায়ের একটি গল্প।
রিজওয়ান সাজানের জন্ম গরিব নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে মুম্বাইয়ের ঘাটকোপার এলাকায়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। তার বাবা কষ্ট করে কনভেন্ট স্কুলের শিক্ষা ফি প্রদান করতেন। মাসে তার হাতে ছিল মাত্র ১৫ রুপি।
সেখানে স্কুলের ক্যানটিনে সহপাঠীদের খাবার খেতে দেখতেন। কিন্তু পকেটে নিজের টাকা ছিল না। এই ছোট্ট অপমান একদিন তার জীবনের মোড় পরিবর্তন আনে।
পরে এক সাক্ষাৎকারে রিজওয়ান সাজান বলেছেন, ‘বন্ধুরা যখন ক্যানটিনে খেত, আমি দূর থেকে দেখতাম। তখন খুব খারাপ লাগত। আমি ঠিক তখনই সিদ্ধান্ত নিই যে, নিজের উপার্জন নিজেই করব।’ মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি প্রথম ব্যবসা শুরু করেন।
তাঁর বাবার কাছ থেকে এক হাজার রুপি ধার নিয়ে ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এই টাকায় মুম্বাইয়ের পাইকারি বাজার থেকে স্কুলের বই কিনে মৌসুমে বিক্রি করতে শুরু করেন। প্রথমে তিনি ৭৫ রুপি লাভ হলেই খুশি হতেন। কিন্তু মৌসুম শেষে লাভ দাঁড়ায় ২০০ রুপি। আজকের দিনে ২০০ রুপি তেমন মূল্য হয়তো নয়। তবে তখন সেই অর্থ রিজওয়ান সাজানের কাছে ছিল বিশাল সম্পদ। প্রথম লাভের টাকা দিয়ে তিনি নিজের জন্য নয়, বন্ধুদের জন্য সমুচা কিনেছিলেন। যে সমুচা খাওয়ার জন্য ব্যবসা শুরু, সেই সমুচাই যেন হয়ে উঠেছিল তার প্রথম সাফল্যের প্রতীক।
১৮ বছর বয়সে রিজওয়ান সাজানের জীবনে আসে একটি বড় ধাক্কা। সেইসময় তার বাবা মারা যান এবং সংসারের সব দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। এরপর তিনি কাজের খোঁজে কুয়েতে পাড়ি জমান। সেখানে তাঁর মাসে ১৮ হাজার রুপি বেতনের একটি চাকরি জোটে। যা ছিল তার পূর্বের জীবনের পঞ্চাশ গুণ। কিন্তু ভাগ্য তার জন্য এছাড়া আরও বড় পরীক্ষা রেখে রেখেছিল।
কুয়েত অধ্যায়ের পর রিজওয়ান দুবাইয়ে চলে আসেন। সেই সময় তাঁর সঞ্চয় ছিল প্রায় এক লাখ দিরহাম। এই অর্থের ব্যাপারে তিনি খুব সচেতনভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন। স্ত্রীর জন্য কিছু অর্থ সহায়তা করেন এবং একটি ছোট অফিস নেন। গাড়ি কেনেন কিস্তিতে। ব্যবসার লাইসেন্স সংগ্রহ করেন। কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য একটি আলাদা তহবিলও রাখেন। নিজেকে তিনি মাত্র তিন মাস সময় দিয়েছিলেন। প্রথম মাসে আয় হয় ৫ হাজার দিরহাম, দ্বিতীয় মাসে ১০ হাজার এবং তৃতীয় মাসে ২০ হাজার। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, তার ব্যবসা সঠিক পথে এগোচ্ছে।
এভাবে ধীরে ধীরে নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ড্যানিউব গ্রুপ। আজ মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণশিল্পে এটি একটি পরিচিত নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল, হোম ইন্টেরিয়র ও রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা বাড়িয়েছে তারা। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক দেশে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। রিজওয়ানের সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার কোটি রুপি। তবে তার ভাষায়, ‘কখনো আমাকে টাকা অনুপ্রাণিত করেনি। কাজই আমাকে অনুপ্রাণিত করে। টাকা কেবল সেই কাজের ফল।’
অপরদিকে বিলাসবহুল জীবনযাপনের পাশাপাশি তিনি অতীতকে ভুলে যাননি। রিজওয়ানের এক সুপ্রসিদ্ধ উক্তি হল—‘আমি বস্তিতে জন্মেছি। পরে চাওলে থেকেছি। আজ ৪০ হাজার বর্গফুটের বাড়িতে থাকি। কিন্তু আমাকে যদি আফ্রিকার কোনো জঙ্গলে কিছু না দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, আমি আবারও নিজেকে গড়ে তুলতে পারব।’ এই আত্মবিশ্বাসই রিজওয়ান সাজানের সাফল্যের মূল রহস্য। কারণ তিনি জানেন, সম্পদ হারানো যায়; কিন্তু অভিজ্ঞতা, সাহস ও উদ্যোগ হারানো অসম্ভব।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন