প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ম্যাকাওয়ের সাবেক আইনপ্রণেতা আউ কাম সানকে আদালত সাড়ে ১২ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছে। এটি ক্যাসিনো নগরী হিসেবে পরিচিত ম্যাকাওয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় প্রথমবারের মতো ঘোষিত রায়। এই রায় রুদ্ধদ্বার আদালতে প্রকাশ করা হয়।
২০২৫ সালে আউ কাম সানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ২০০৯ সালে ম্যাকাওয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর হওয়ার পর এই আইনের আওতায় এটি ছিল প্রথম প্রকাশ্যে জানা গ্রেপ্তারের ঘটনা। তার বিরুদ্ধে মামলাটি হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন দমনে বেইজিংয়ের কঠোর পদক্ষেপের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আউয়ের পরিবার অভিযোগ করেছে, গ্রেপ্তারের পর থেকে তাকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এমনকি তিনি নিজের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। আউ কাম সানকে ‘রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড’ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে ম্যাকাওয়ের বাইরের বিভিন্ন সংগঠন, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়, আউ দীর্ঘদিন ধরে বাইরের কয়েকটি সংগঠনকে সহায়তা করেছেন। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন ছবি ও তথ্য সংগ্রহ, তৈরি এবং জনসমক্ষে প্রকাশেও সহায়তা করেছেন।
আদালতের রায়ে আরও বলা হয়, আউ ম্যাকাওয়ের বাসিন্দাদের মধ্যে চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সংবিধানে নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দুর্বল ও উৎখাত করা। গত সেপ্টেম্বরে রুদ্ধদ্বার আদালতে তার বিচার শুরু হয় এবং মাত্র তিন দিনের মধ্যে তা শেষ হয়।
‘জাস্টিস অ্যাব্রড’-এর পরিচালক মাইকেল পোলাক, যিনি আউয়ের পরিবারকে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন, তার বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘প্রহসন’ বলে অভিহিত করেছেন।
তার মতে, এই ঘটনা ম্যাকাওয়ের জন্য লজ্জাজনক এবং বিশ্বে অঞ্চলটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে। তিনি ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’কে বলেন, আউয়ের বিচার ও তার বিরুদ্ধে আনা ‘মনগড়া অভিযোগ’ ম্যাকাওকে বিশ্বের সবচেয়ে দমনমূলক অঞ্চলগুলোর কাতারে নিয়ে গেছে। এসব জায়গায় নির্বাহী কর্তৃপক্ষ নিজেদের বিরোধীদের যথাযথ ও সুষ্ঠু বিচারপ্রক্রিয়া ছাড়াই কারাগারে পাঠানোর ক্ষমতা রাখে।
৬৯ বছর বয়সী আউ পর্তুগালেরও নাগরিক। তিনি ম্যাকাওয়ের অন্যতম প্রধান বিরোধী নেতা। বেইজিংপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আইনসভায় তিনি প্রায় ২০ বছর আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত বছর তার গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তবে তার মুক্তির দাবি জানায়নি সংস্থাটি।
মাইকেল পোলাক পর্তুগাল ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন আউকে ম্যাকাও ছাড়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানায়। তার মতে, এতে আউকে ‘মনগড়া অভিযোগে’ এক দশকের বেশি সময় কারাগারে কাটাতে হবে না।
লন্ডনপ্রবাসী আউয়ের মেয়ে চেরি আউ ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’কে জানিয়েছেন, তার বাবা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এ কারণে কারাগারে তার স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবার উদ্বিগ্ন। চেরি বলেন, ‘সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, যে সরকারের জন্য তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, সেই সরকারই এখন তাকে অপরাধী হিসেবে তুলে ধরছে।
আমি আশা করি, মানুষ তার দীর্ঘদিনের কাজ ও অবদানের কথা মনে রাখবে। তার ওপর মানুষ আস্থা রেখেছিল এবং বারবার নির্বাচিত করেছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার বাবা এখন চরম অবিচারের শিকার। যারা তার অবদান জানেন, পাশে দাড়ান।’
পেশায় শিক্ষক আউ ২০ বছর ম্যাকাওয়ের আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৮৯ সালে বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে বিক্ষোভ দমনের ঘটনার স্মরণে ম্যাকাওয়ে আয়োজিত কর্মসূচির অন্যতম সংগঠকও ছিলেন তিনি।
গত বছরের জুলাইয়ে নিজের বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ, তিনি ম্যাকাওয়ের বাইরের বিভিন্ন ‘শত্রুভাবাপন্ন’ সংগঠনকে সহায়তা করেছেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য সংগ্রহ ও প্রচার এবং মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভিন্নমত দমনের কঠোর নীতি এবার ম্যাকাওয়েও ছড়িয়ে পড়েছে। সাবেক আইনপ্রণেতা আউ কাম সানের বিরুদ্ধে মামলা করে নতুন জাতীয় নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ আরও কঠোর করতে চাইছে কর্তৃপক্ষ।
ম্যাকাও ১৯৯৯ সালে পর্তুগালের কাছ থেকে চীনের শাসনে আসে। এরপর থেকে এটি হংকংয়ের মতো বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। অঞ্চলটির নিজস্ব রাজনৈতিক ও আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। ম্যাকাও চীনের একমাত্র শহর, যেখানে ক্যাসিনোতে জুয়া খেলা বৈধ।
এখানে এমজিএম, লাস ভেগাস স্যান্ডস ও উইন রিসোর্টসের মতো বড় মার্কিন প্রতিষ্ঠান হোটেল ও ক্যাসিনো পরিচালনা করে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, আউয়ের বিরুদ্ধে এই মামলা ম্যাকাওয়ের অন্য সমালোচকদের মধ্যেও ভীতি তৈরি করবে। সংস্থাটির এশিয়া বিষয়ক উপপরিচালক মায়া ওয়াং বলেন, ম্যাকাওয়ে গণতন্ত্রপন্থীদের কণ্ঠরোধের ঘটনা চীনে ভিন্নমত ও মানুষের মৌলিক অধিকার দমনের বৃহত্তর নীতিরই অংশ।
আউ জানান, সমাজের নানা সমস্যা দেখে তিনি রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তার মতে, এসব বিষয়ে মানুষের কথা বলা প্রয়োজন। ১৯৮৯ সালে বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন তাকে ও তার সমমনা বন্ধুদের রাজনীতিতে যুক্ত হতে অনুপ্রাণিত করে। পরে ম্যাকাওয়ে গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ার জন্য কাজ শুরু করেন।
গ্রেপ্তারের আগে আউ নিয়মিত ফেসবুক ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সরকারের সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করতেন। ম্যাকাওয়ে সরকারের সমালোচনা করা বিরল ব্যক্তিদের একজন ছিলেন তিনি। তবে তার সমালোচনার ভাষা বেশির ভাগ সময়ই ছিল সংযত।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন