প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আজ বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় এটি প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া। ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে মৃত্যুর মাধ্যমে দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী এই নেত্রীর দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায় সমাপ্ত হয়। ফলে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পাশাপাশি বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবদান, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব বিশেষভাবে স্মরণ করছে বিএনপি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর। প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক পথচলায় দলটি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, বিরোধী দলে থেকেছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেছে। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসা বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল প্রায় ৪৩ বছরের। ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে যোগদানের পর ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর থেকে তিনি আমৃত্যু দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম খালেদা জিয়া। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮০-এর দশকে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করে তিনি দলটিকে সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠিত করেন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯০ সালের গণ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় অধ্যায় ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এরপর সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন যাত্রায় খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর সরকারের সময় সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলেও বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া। বিশেষ করে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ের পর তিনি আবার সরকারপ্রধান হন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি একদিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে, অন্যদিকে দলীয় সংগঠনও বিস্তৃত করে।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্ক ও কঠিন সংকটে পরিপূর্ণ। ২০০৭ সালের পর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট, কারাবাস, মামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ডের পর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে। বিএনপি বরাবরই এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর খালেদা জিয়া মুক্তি পেলেও শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে রাখে। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু ঘটে। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আবেগ তাই আলাদা। বিএনপির জন্য ১ সেপ্টেম্বর শুধুমাত্র দল প্রতিষ্ঠার দিন নয়; এটি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং খালেদা জিয়ার দীর্ঘ নেতৃত্বকে স্মরণ করার দিনও হয়ে উঠছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, খালেদা জিয়ার অবর্তমানে বিএনপির সামনে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর উত্তরাধিকারকে রাজনীতিতে কীভাবে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত করা যায়। দীর্ঘদিন বিএনপির নেতা-কর্মীদের কাছে খালেদা জিয়া ছিলেন দলের ঐক্যের অন্যতম প্রধান প্রতীক। তাঁর নেতৃত্বে দলটি একাধিক রাজনৈতিক আন্দোলন ও নির্বাচন মোকাবিলা করেছে। ফলে তাঁর অবর্তমানে দলীয় ঐক্য, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং নতুন নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই ক্ষেত্রে তারেক রহমানের নেতৃত্বও বিশেষভাবে আলোচনায় আসছে। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর তিনি দেশে ফিরে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন পর্যায়ের সূচনা করেছেন। ফলে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণ করে দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়া তাঁর জন্যও বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির সামনে তাই একই সঙ্গে রয়েছে আবেগ ও রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার সুযোগ। একদিকে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আদর্শ, অন্যদিকে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম-এ দুই উত্তরাধিকার সামনে রেখে ভবিষ্যৎ পথচলার বার্তা দিতে চাইবে বিএনপি। ৪৮ বছরে বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দলটির উত্থানপতন, আন্দোলন-সংগ্রাম, সরকার পরিচালনা এবং বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় অংশ জড়িয়ে আছে। আর সেই ইতিহাসে খালেদা জিয়ার অধ্যায়টি নিঃসন্দেহে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্তির আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একই সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক বিশাল অবদান স্মরণের দিন। একই সঙ্গে তাঁর অবর্তমানে বিএনপির নতুন অধ্যায়ের সূচনার প্রতীকী মুহূর্ত। এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “গণতন্ত্রের মাতা ও আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেখিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের পথেই বিএনপির পথচলা। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, জাতীয়তাবাদ থাকবে, তত দিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন