প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মিজানুর রহমান, যিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, একটি চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। রোকসানা, যিনি এক পা ও এক হাতের তিনটি আঙুল হারিয়েছেন, ভিক্ষাবৃত্তি থেকে সম্মানজনকভাবে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন। শুক্কুর আলী, যিনি স্ট্রোকে শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছেন, মাথা গোঁজার জন্য একটি ঘর চেয়েছিলেন। এই তিনজন বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়ে তাদের স্বপ্ন ও দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া তাদের কথা শুনে সহায়তার আশ্বাস প্রদান করেন।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাপ্তাহিক গণশুনানিতে মিজানুর রহমান চাকরির জন্য আকুতি জানান। রোকসানার জন্য একটি চাকরির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুক্কুর আলীর জন্য একটি ঘর নির্মাণের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। হতাশা ও দুশ্চিন্তা নিয়ে জেলা প্রশাসকের কক্ষে প্রবেশ করলেও বের হওয়ার সময় তিনজনের মুখে ছিল হাসি।
মিজানুর রহমান (৩৯) গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বনখরিয়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মিজানুরের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তার মেয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং ঢাকার জাতীয় বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্রে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। ছেলে মাদরাসায় হিফজ বিভাগে পড়াশোনা করছে। অসুস্থ মা ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তার সংসার চলছে।
মিজানুর জানান, তাদের কোনো জমিজমা নেই এবং পরিবার চালাতে তার একটি সরকারি চাকরি প্রয়োজন। কিন্তু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় চাকরি পাওয়া তার জন্য কঠিন। তিনি জেলা প্রশাসককে জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নিজের সমস্যার কথা জানাতে চান।
জেলা প্রশাসক মিজানুরের কথা শুনে তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তার মেয়েও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় পরিবারের অসহায়ত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সঙ্গে কথা বলে মিজানুরের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন বলে জানান। জেলা প্রশাসক মিজানুরের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করারও কথা বলেন।
গাজীপুর মহানগরের মাষ্টারবাড়ি এলাকার রোকসানার (২৫) জীবন সংগ্রাম আরো কঠিন। তার বাড়ি বগুড়ায়। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে তার ডান পা এবং বাঁ হাতের তিনটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে পরিবার তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামায়।
বড় হয়ে রোকসানার বিয়ে হয় এক রাজমিস্ত্রির সহকারী শ্রমিকের সঙ্গে। স্বামীর আয় ছিল অনিয়মিত। রোকসানা অন্তঃসত্ত্বা হলে প্রতিপক্ষের হামলায় তার স্বামী মারা যান। সন্তানকে মায়ের কাছে রেখে জীবিকার সন্ধানে গাজীপুরে এসে আবারও ভিক্ষাবৃত্তিতে নামতে হয় তাকে।
রোকসানা জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে একটি চাকরির ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান। জেলা প্রশাসক জানান, রোকসানার জন্য গাজীপুরের কাশিমপুরে একটি বড় ও সুনামধন্য পোশাক কারখানায় তাৎক্ষণিক চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পূবাইলের হারবাইদ এলাকার বাসিন্দা শুক্কুর আলী (৪৩) দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। তার কোনো জমিজমা নেই এবং স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অন্যের বাড়িতে থাকতেন। প্রায় দুই বছর আগে স্ট্রোক করার পর শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। ফলে তার আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়।
শুক্কুর আলী জানান, তার দুর্দশা দেখে একজন ব্যক্তি ঘর নির্মাণের জন্য কিছু জমি দিতে চেয়েছেন। কিন্তু ঘর নির্মাণের সামর্থ্য তার নেই। তাই তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে একটি ঘর নির্মাণের আবেদন করেন। জেলা প্রশাসক তার আবেদন শুনে ঘর নির্মাণের আশ্বাস দেন।
বুধবারের গণশুনানিতে মিজান, রোকসানা ও শুক্কুর ছাড়াও অর্ধশতাধিক মানুষ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আসেন। তাদের মধ্যে কেউ এসেছেন চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চাইতে, কেউ গৃহসংকট, জমিজমা, বয়স্ক ভাতার কার্ড, ভাড়া না পাওয়া কিংবা এলএ বিলসংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে।
নিঃসন্তান ফিরোজা বেগম চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চান। ক্যানসারে আক্রান্ত বিধবা নাজমা চিকিৎসার খরচের জন্য সহায়তা চান। বৃদ্ধ আবুল হোসেন মৃধা ভাঙা ঘর মেরামতের জন্য টিন চেয়েছেন। ভোগড়া থেকে বিল্লাল হোসেন অভিযোগ করেন, তার ভাড়াটিয়া দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া পরিশোধ করছেন না।
শ্রীপুর থেকে আসা আশরাফুল ইসলাম রয়েল এলএ বিল পেতে ঘুষ দাবির অভিযোগ করেন। প্রতিবন্ধী শিরিন বয়স্ক ভাতার কার্ডের আবেদন করেন। আমেনা বেগম জমিসংক্রান্ত সমস্যার কথা জানান। কলেজছাত্র ও এতিম ফাহিমসহ কয়েকজন আর্থিক সহায়তার আবেদন করেন। হোসনেয়ারা, আবদুর রহিম ও আবদুর রাজ্জাক চিকিৎসা সহায়তার আবেদন নিয়ে আসেন।
মৃত সাংবাদিক আবদুল মজিদের স্ত্রী তামান্না আফরোজা তার সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে সহযোগিতা চান।
গণশুনানিতে আসা প্রত্যেকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন জেলা প্রশাসক। সমস্যার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগও নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সমস্যার সমাধান করাই গণশুনানির মূল উদ্দেশ্য। তিনি জানান, সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন তারা। মিজানুর রহমান, রোকসানা ও শুক্কুর আলীর মতো মানুষের সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন