প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে জনবল সংকট ও অচল যন্ত্রপাতির কারণে চিকিৎসাসেবা খুঁড়িয়ে চলছে। ফলে রোগীদের দুর্ভোগ ও হয়রানি বাড়ছে। দালালদের খপ্পরে পড়ে রোগীরা বিপদে পড়ছেন। জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকটের কারণে এ জেলার ২২ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা চলছে জোড়াতালি দিয়ে।
জানা গেছে, মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন সকাল থেকেই বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। বহির্বিভাগে গড়ে ১ হাজার ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। ২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন প্রায় ৩৫০ থেকে ৪৫০ জন রোগী, কখনো কখনো আরো বেশি। অতিরিক্ত রোগীদের ওয়ার্ডের মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। অনেক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এই হাসপাতালে করানো যাচ্ছে না। কিছু যন্ত্র অচল, আর কিছু সপ্তাহে দুই বা তিন দিনই চলে। ফলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে ছুটতে হচ্ছে। ভোগান্তি ও খরচ বাড়ছে। আইসিইউ, সিসিইউ ওয়ার্ড থাকলেও যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় লোকবল নেই। গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসার জন্য আসা রোগীদের সিলেটে রেফার্ড করা হয়। সবসময় পর্যাপ্ত ওষুধও থাকে না।
জেলার সাতটি উপজেলার প্রায় ২২ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা এই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টের সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় রোগনির্ণয়ক যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। হাসপাতালটিতে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক চিকিৎসক দিয়ে চলছে কার্যক্রম। শয্যাসংকটও রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যন্ত্রপাতি অচল থাকায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ৪১২টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ১০৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসকের ৮৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৯ জন, শূন্য পদ রয়েছে ৪৫টি। অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত রয়েছেন একজন এবং স্বেচ্ছায় অবসরের জন্য আবেদন করেছেন দুজন। এছাড়া কয়েকজন প্রশিক্ষণে আছেন। আরো কয়েকজন কর্মচারীও অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত রয়েছেন। সীমিতসংখ্যক চিকিৎসককে দিয়েই প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। বিশেষ করে অর্থোপেডিক, সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসক সংকট প্রকট। নাক-কান-গলা, চর্মসহ নানা রোগের চিকিৎসকও দীর্ঘদিন ধরে নেই। হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৮৪টি, শূন্য রয়েছে ৪৫টি; নার্স ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারীর পদ ১৯০টি, শূন্য রয়েছে ২১টি; তৃতীয় শ্রেণির পদ ৫৫টি, শূন্য রয়েছে ১৬টি; চতুর্থ শ্রেণির পদ ২২টি, শূন্য আছে ১৩টি; চতুর্থ শ্রেণির আউটসোর্সিং পদ ৬১টি, শূন্য রয়েছে ১৪টি।
হাসপাতালে ১৪ জন টেকনোলজিস্টের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন ৯ জন। জনবল ও রিএজেন্ট সংকটে সপ্তাহে মাত্র তিন দিন এক্স-রে, দুদিন সিটি স্ক্যান এবং চার দিন আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা চালু থাকে। এমআরআই সেবা পুরোপুরি বন্ধ। সিসিইউ ও আইসিইউ অচল রয়েছে। ডায়ালাইসিস সেবাতেও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যের সংকট রয়েছে। ফলে সরকারি হাসপাতালে কম খরচে পরীক্ষা করানোর সুযোগ না পেয়ে অনেক রোগীকেই বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার ব্যয় বাড়ছে এবং রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষকে বেশি চাপ নিতে হচ্ছে।
২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে রক্ত পরীক্ষার জাপানি মেশিন, এমআরআই মেশিনসহ ২৭টি যন্ত্রপাতি বিভিন্ন কারণে সম্পূর্ণ অচল অবস্থায় রয়েছে। এমআরআই মেশিনের প্রস্তুতকারক কোম্পানি ফিলিপস মেশিনটিকে সম্পূর্ণ অকেজো ঘোষণা করেছে।
ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডে সপ্তাহে দুবার ডায়ালাইসিস করার কথা থাকলেও একবার করা হচ্ছে। প্রচুর অর্থসংকট ও রিএজেন্ট বা ফ্লুইড সংকট রয়েছে। এটি যেকোনো মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া প্যাথলজির বড় বড় মেশিন রিএজেন্ট ও প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে বন্ধ রয়েছে। রোগী ও স্বজনরা দাবি করছেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগের পাশাপাশি অচল যন্ত্রপাতি সচল করা এবং নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হোক।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মৌলভীবাজারের সভাপতি ডা. সাদিক আহমেদ জানান, দীর্ঘদিন ধরে মৌলভীবাজারের সর্বস্তরের মানুষ একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য দাবি জানিয়ে আসছেন। এ বিষয়ে আন্দোলনও হয়েছে। তবে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তাই অচিরেই প্রয়োজনীয় লোকবল দিয়ে ২৫০ শয্যার হাসপাতালটি ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হোক। পাশাপাশি জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হোক।
রোগী কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি, সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব বলেন, “সাধারণত গরিব লোকেরাই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের সেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।” তাই অচিরেই হাসপাতালটির সব সমস্যা দূর করার জোর দাবি জানান তিনি।
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাস বলেন, “হাসপাতালে নানা সংকট রয়েছে। এসব সংকট সমাধানে কাজ করা হচ্ছে। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জনবল সংকট নিয়ে এত রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।” তিনি জানান, ওষুধের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। সেগুলো সমাধানের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন