প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা, ১১ অক্টোবর, ২০২৬ : সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন মন্তব্য করেছেন যে, সমাজের গভীরে বিদ্যমান সংকট ও অপরাধের স্থায়ী সমাধান কেবল আইন-আদালত, পুলিশ প্রশাসন কিংবা হাসপাতাল বৃদ্ধি করে সম্ভব নয়।
তিনি উল্লেখ করেন, এই সংকট ও অপরাধের স্থায়ী সমাধানের জন্য মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সমন্বিত সামাজিক ও মনোদৈহিক (সাইকোসোশ্যাল) পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ‘ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ আয়োজিত একটি জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
ডা. জাহিদ দেশের জনসংখ্যা ও অপরাধের বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন, জানিয়ে দেন যে, দেশের জনসংখ্যা ১৮০ মিলিয়ন এবং ভূখণ্ড ৫৬ হাজার ১২৬ বর্গমাইল।
তিনি আরও বলেন, ‘এই বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় আপনি কত জেলখানা বানাবেন, কত হাসপাতাল বানাবেন? কত পুলিশ, ডাক্তার কিংবা নার্স নিয়োগ দেবেন? হাউ ইউ আর গোয়িং টু অ্যাড্রেস দিস ইস্যুজ?’
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, অপরাধের পেছনে থাকা সামাজিক ও পারিবারিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করে যদি স্থায়ী প্রতিকার করতে না পারি, তবে কোনো সমস্যারই সমাধান হবে না।
দেশের ডেমোগ্রাফিক বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে যে দেশের মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী এবং ৩৪ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। সাইকোসোশ্যাল কাজ করার প্রধান ক্ষেত্র কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠী।
বাল্যবিয়ের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ বলেন, ‘দেশে বর্তমানে প্রায় ৫১ শতাংশ বাল্যবিয়ে হচ্ছে, যা একটি সভ্য সমাজে অকল্পনীয় ও অসহনীয় (আনবেয়ারেবল)। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেন—‘এটা আমরা করবই, কে ফিরায়?’ এই ধরনের গোঁয়ার্তুমি ও অবুঝ মানসিকতা শুধু আইন প্রয়োগ করে বন্ধ করা যাবে না।’
তিনি আরও বলেন, অল্প বয়সে বিয়ের কারণে মা ও অনাগত সন্তানের শারীরিক, মানসিক ও পুষ্টিগত যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তা উপলব্ধি করানোর জন্য সমাজকর্মী ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের (সাইকোসোশ্যাল অ্যাপ্রোচ) কোনো বিকল্প নেই।
মাঠপর্যায়ে দক্ষ সমাজকর্মীর ঘাটতির চিত্র তুলে ধরে অধ্যাপক ডা. জাহিদ আরও বলেন, গ্রামে বা ওয়ার্ডে নবম গ্রেডের কোনো কর্মকর্তা থাকেন না, কেবল ইউনিয়ন পর্যায়ে একজন ডাক্তার থাকেন। বাকি সবাই দশম বা তার নিচের গ্রেডের।
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি বিভাগে যেমন প্রতিটি ইউনিয়নে ৩ জন করে ব্লক সুপারভাইজার আছেন কিংবা স্বাস্থ্য বিভাগে প্রতি ৪ হাজার মানুষের জন্য হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট আছেন, সমাজকল্যাণেও তৃণমূল পর্যায়ে তেমন জনবল দরকার।’
মন্ত্রী বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে শুধু এইচএসসি পাসের সনদের ভিত্তিতে সোশ্যাল ওয়ার্কার নিয়োগ দিলে হবে না। তাদের থিওরিটিক্যাল ও প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান থাকতে হবে।’
এ সময় তিনি আরও বলেন, অতীতে রাজনৈতিক বা খেয়ালখুশি মতো অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সরকার একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাই রাতারাতি সব বাতিল না করে, বিদ্যমান কাঠামোগুলোকে জনবান্ধব ও যুগোপযোগী করার কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, গবেষক ও একাডেমিশিয়ানদের যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের মিসপারসেপশন আছে যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বলতেই আমরা বুঝি যে খুব সিভিয়ার কিছু হচ্ছে। রোগী হয়তো চিৎকার করছে, রোগীর হয়তো সিজোফ্রেনিয়া হচ্ছে, সেগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, একই সাথে আমাদের এই সচেতনতা জনগণের মাধ্যমে তৈরি করা প্রয়োজন যে আমরা একেবারে খুবই হেলদি লুকিং, ওয়েল ফাংশনিং নাগরিক যারা আছে তারা অনেকেই কিন্তু ডিপ্রেশনে ভুগছেন।
বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা কয়েকটি বিষয়কে প্রায়োরিটি হিসেবে আইডেন্টিফাই করেছি। অ্যাডোলেসেন্ট মেন্টাল হেলথ, ডিজিটাল অ্যাডিকশন ও প্যারেন্টাল সেপারেশন— এই তিনটা কিন্তু আমাদের সমাজে আগে বড় ধরণের কোনো সমস্যা ছিল না।’
এছাড়া তিনি ‘ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স অ্যান্ড ডোমেস্টিক ট্রমা’ ও ‘পেরিনেটাল অ্যান্ড পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন’ মোকাবিলাতেও বিশেষ জোর দেওয়ার কথা জানান।
সেমিনারে সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক তাহমিনা আক্তারের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম।
এতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও পেশাদার সমাজকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন