প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সরকারি কর্মচারীদের বহুদিনের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন পে স্কেলের সরকারি আদেশ বা গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, তবে আনন্দের সঙ্গে কিছু চিন্তার ভাজও দেখা দিয়েছে। বেতন-ভাতার নতুন কাঠামো হাতে আসার পর কর্মচারীদের মনে একের পর এক নতুন প্রশ্ন দানা বাঁধছে। বিশেষত, গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতার অদ্ভুত হিসাব দেখে তৈরি হয়েছে চরম বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ।
কাগজে-কলমে পদোন্নতি পেয়ে ওপরের গ্রেডে উঠলে মূল বেতন বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু বাড়িভাড়ার হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে উলটো দৃশ্য— পকেটে আসা মোট টাকা যেন কমে যাওয়ার জোগাড়! নতুন নিয়ম অনুযায়ী, রাজধানী ও বড় শহরগুলোর বাইরে অর্থাৎ দেশের অন্যান্য এলাকায় কর্মরত ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা তাদের মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা পাবেন। কিন্তু বিপত্তি বেঁধেছে এর ঠিক ওপরের ধাপে গিয়ে! ১০ থেকে ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এ বাড়িভাড়ার হার কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ।
এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। যখন কোনো কর্মচারী ১৬তম গ্রেড থেকে পদোন্নতি পেয়ে ১৫তম গ্রেডে উঠছেন, তখন তার মূল বেতন সামান্য একটু বাড়লেও বাড়িভাড়ার হারের এই ১০ শতাংশ ব্যবধানের কারণে দিনশেষে তার ভাতার অংকটাই ছোট হয়ে আসছে। ফলে পদোন্নতির আনন্দ ফিকে হয়ে সেখানে স্থান করে নিচ্ছে একরাশ হতাশা।
নতুন পে স্কেলে ১৬তম গ্রেডের শুরুতেই মূল বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা। এর ৪৫ শতাংশ হিসাবে বাড়িভাড়া দাঁড়ায় ৯ হাজার ৮৫৫ টাকা। অন্যদিকে ১৫তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২২ হাজার ৮০০ টাকা। কিন্তু ৩৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া হবে সাত হাজার ৯৮০ টাকা। অর্থাৎ ১৫তম গ্রেডে মূল বেতন ৯০০ টাকা বেশি হলেও বাড়িভাড়া কমে যাচ্ছে এক হাজার ৮৭৫ টাকা। ফলে শুধু মূল বেতন নয়, গ্রেড পরিবর্তনের পর মোট আর্থিক সুবিধার কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন কর্মচারীরা। তবে বাড়িভাড়ার এই হিসাব দিয়ে দুই গ্রেডের মোট বেতন-ভাতার চূড়ান্ত তুলনা করা যাবে না।
কারণ একজন কর্মচারীর মোট আর্থিক সুবিধার সঙ্গে চিকিৎসা, শিক্ষা, উৎসব, মোবাইলসহ বিভিন্ন প্রযোজ্য ভাতা যুক্ত থাকে। ফলে প্রকৃত আর্থিক পার্থক্য নির্ধারণে পুরো বেতন-ভাতা কাঠামো বিবেচনা করা প্রয়োজন। নতুন পে স্কেলের নিয়মকানুন ঘেঁটে বেরিয়ে আসছে আরও কিছু পরিবর্তনের খবর, যা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চলছে জোর আলোচনা।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের একটি এসেছে বাংলা নববর্ষ ভাতার ক্ষেত্রে। এতদিন মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে এ উৎসব ভাতা দেওয়া হলেও নতুন কাঠামোতে তা কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে এখনই এই কোপ পড়ছে না কর্মচারীদের পকেটে। গেজেটের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরনো নিয়মেই অর্থাৎ ২০ শতাংশ হারেই বৈশাখী ভাতা মিলবে। আর কমানো এই ১৫ শতাংশের নতুন নিয়মটি কার্যকর করা হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
সন্তানদের লেখাপড়ার খরচের বাবদ যে ‘শিক্ষা সহায়ক ভাতা’ রাখা হয়েছে, তা নিয়েও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য মাসে মোট এক হাজার টাকা দেওয়া হবে। তবে বর্তমান যুগে আকাশছোঁয়া শিক্ষা খরচের রাজত্বে এ সামান্য টাকা কতটুকু স্বস্তি দেবে, তা নিয়ে কর্মচারীরা ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্ন তুলছেন।
তবে সব খবরের মধ্যে একটি স্বস্তির বার্তাও এসেছে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে। আগে পদোন্নতি না পেয়ে একটানা ১০ বছর অপেক্ষা করার পর শর্তসাপেক্ষে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যে নিয়ম ছিল, নতুন পে স্কেলে সেই সময়টা দুই বছর কমিয়ে আট বছরে আনা হয়েছে। অর্থাৎ, পদোন্নতি না হলেও যদি নির্ধারিত শর্ত পূরণ করা যায়, তবে আট বছর পার হলেই মিলবে উচ্চতর গ্রেড। তবে স্বস্তির সঙ্গে সঙ্গে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে— এ উচ্চতর গ্রেড পাওয়াকে কোনোভাবেই নিয়মিত ‘পদোন্নতি’ হিসেবে গণ্য করা হবে না।
নতুন পে স্কেলে মোট ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে। ২০তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। ১৬তম গ্রেডে ২১ হাজার ৯০০ টাকা এবং ১৫তম গ্রেডে ২২ হাজার ৮০০ টাকা। সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডে মূল বেতন এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নতুন বেতনের পুরো সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। কাঠামোটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা নতুন মূল বেতনের বাড়তি অংশের ৫০ শতাংশ পাবেন। নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই হার ৪০ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে পুরো বেতন কার্যকর হবে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের ব্যানারে আজ সোমবার সারা দেশের অন্তত ১৩টি সংগঠনের নেতারা নতুন পে স্কেলের বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে করণীয় নির্ধারণে বৈঠক ডেকেছেন। পরিষদের সদস্যসচিব মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, "এত দিন পরে একটি নতুন পে স্কেল পেলাম। সেটাতেও বৈষম্য। এই বৈষম্য আগেও ছিল। নতুন বেতন কাঠামোতেও থেকে গেল। যা আমাদের জন্য মেনে নেওয়া কষ্টসাধ্য এবং অসম্মানের।"
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন