প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশের ইতিহাসে বর্তমানে পর্যন্ত ১৮ জন পূর্ণাঙ্গ, ভারপ্রাপ্ত কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে ১০ জনের কার্যকাল আলাদা করে বলতে গেলে সমাপ্তি হয়েছে আকস্মিকভাবে। সবশেষ গতকাল শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন মো. শাহাবুদ্দিন।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশে হত্যাকাণ্ড, সামরিক অভ্যুত্থান, সাংবিধানিক পরিবর্তন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় রাষ্ট্রপতির পদ বারবার সংকটে পড়েছে। এই পদে থাকাকালীন দুইজন নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্দোলনের কারণে আটজনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়েছে কিংবা বঙ্গভবন ছাড়তে হয়েছে। এবার মো. সাহাবুদ্দিন তার পদত্যাগের মাধ্যমে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে না পারা রাষ্ট্রপতিদের তালিকায় যুক্ত হলেন।
দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যায় রাষ্ট্রপতির পদ উঠে আসে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হন, যদিও ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
পরে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সায়েম পদত্যাগ করার পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে পর্যন্ত জিয়াউর রহমান দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে নিহত হন।
এরপর আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান হলে রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
এরশাদ পরে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন এবং বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে বসান। আহসানউদ্দিন চৌধুরী ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ থেকে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে তিনি পাঁচ বছরের মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, কিন্তু পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এরশাদের পদত্যাগের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে উপরাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ছিলেন।
১৯৯১ সালে দেশে আবার সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরে আসে। বিএনপি সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করার পর মন্ত্রিসভার সদস্য আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
পরে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর তিনি শপথ নেন এবং ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হয়।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ২০০২ সালের ২১ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির সংসদীয় দল তাকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলার পর তিনি পদত্যাগ করেন।
দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার কবরে শ্রদ্ধা না জানানোর কারণে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিএনপির ব্যাপক সমালোচনা হয়।
তার পদত্যাগের পর তৎকালীন স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপির সমর্থনে ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ।
২০০৬ সালের শেষে ইয়াজউদ্দিন সংবিধান লঙ্ঘন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন এবং এর ফলে দেশ এক গভীর রাজনৈতিক সংকটে ভুগতে থাকে।
অবশেষে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর তিনি প্রধান উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর ফলে ২২ জানুয়ারি নির্ধারিত সংসদ নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। পরদিন তিনি ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন।
২০০৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইয়াজউদ্দীনের রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হলেও, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকেন। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতা জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০১৩ সালের ২০ মার্চ জিল্লুর রহমান মারা যান। রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালে তারই স্বাভাবিক মৃত্যুহার হয়।
তার মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের আরেক নেতা ও তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন। তিনি ২০১৩ সালের ২০ মার্চ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরে আওয়ামী লীগের সমর্থনে পরপর দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আবদুল হামিদ।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন, যিনি ১৯৭৫ সালে পাবনা জেলা বাকশালের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি পদ হুমকির সম্মুখীন হয়। বিভিন্ন সময় তার পদত্যাগ বা অপসারণের বিষয়ে গুজব ও জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে।
অবশেষে গতকাল শুক্রবার শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি জানিয়ে তিনি পদত্যাগ করলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন