প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইউক্রেনের সাবেক সেনা সদস্য সেরহি লাজারেঙ্কো ভাগ্যকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। যখনই তিনি নিজের অঞ্চল জাকারপট্টিয়াকে ‘শান্ত’ বলে উল্লেখ করেন, তখন তিনি প্রথাগতভাবে তিনবার থুতু ফেলেন—এটি যেন কোনো দুর্ভাগ্য বা রুশ হামলা সেখানে আঘাত হানতে না পারে।
এটি জানানো হয়েছে সংবাদ সংস্থা এএফপি’র মাধ্যমে।
কার্পাথিয়ান পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত ইউক্রেনের পশ্চিমতম অঞ্চল জাকারপট্টিয়া। স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এই অঞ্চলটি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে বড় ধরনের হামলা থেকে তুলনামূলকভাবে রক্ষা পেয়েছে।
দেশটির পূর্বাঞ্চলে তীব্র লড়াই চলছে। একই সময়ে রুশ ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনের অন্যান্য এলাকায় নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন এবং হাজার হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হতে হচ্ছে।
জাকারপট্টিয়ার বাসিন্দারাও যুদ্ধের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সেখানে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। সম্মুখযুদ্ধে স্থানীয় অনেক পরিচিতজনকেও তারা হারিয়েছেন। তবে বিমান হামলার সাইরেন ও বিস্ফোরণের শব্দ ছাড়া রাত কাটাতে পারাকে তারা বড় স্বস্তি হিসেবে দেখছেন।
লাঠিতে ভর দিয়ে বেরেহোভ শহরের কেন্দ্র দিয়ে হাঁটার সময় লাজারেঙ্কো এএফপিকে বলেন, “সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, এখানে সবকিছু শান্ত।”
যুদ্ধের আগে বেরেহোভে প্রায় ২৩ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। হাঙ্গেরির সীমান্ত থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরের এই শহরটি কিয়েভ থেকে সড়কপথে প্রায় ১১ ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। শহরের রাস্তায় স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষায় কথা বলা মানুষেরও দেখা যায়। তারা বাজার করছেন, প্রয়োজনীয় কাজ সারছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
৫৪ বছর বয়সী লাজারেঙ্কো বেরেহোভের স্থানীয় বাসিন্দা। রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পরপরই তিনি যুদ্ধে যোগদান করেন।
যুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী লড়াই বাখমুতের যুদ্ধে গুরুতর আহত হয়ে তিনি নিজ শহরে ফিরে আসেন। বর্তমানে তার শহরটি বোমা হামলা ও রুশ দখল থেকে পালিয়ে আসা বহু ইউক্রেনীয়কে আশ্রয় দিচ্ছে।
তিনি বলেন, “কখনো কখনো শহরে গেলে নিজের এলাকার মানুষই যেন আর তেমন চোখে পড়ে না—এত বেশি মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে।” তবে নতুন আসা মানুষদের সঙ্গে স্থানীয়দের সম্পর্ক ভালো বলেও জানান তিনি।
বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে রয়েছেন লিউবভ কিরেইয়েভা। ২০২২ সালে তিনি পরিবার ও সহকর্মীদের সঙ্গে ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চল থেকে জাকারপট্টিয়ায় চলে আসেন।
তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, সেটি ধাতব পণ্য উৎপাদনকারী একটি বড় কোম্পানি। যুদ্ধের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বেরেহোভে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে একটি পরিত্যক্ত কারখানা সংস্কার করে আবার উৎপাদন শুরু করা হয়েছে।
কিরেইয়েভা এএফপিকে বলেন, “এখানে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধের উপস্থিতি খুব কম অনুভব হয়।”
রাশিয়ার বিমান হামলায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেও জাকারপট্টিয়ায় তা খুবই কম। সেখানে যুদ্ধকালীন কারফিউও নেই।
৪১ বছর বয়সী কিরেইয়েভা বলেন, “বিমান হামলার সতর্কসংকেত আমরা প্রায় শুনতেই পাই না।” এমনকি ইউক্রেনের কিছু অঞ্চলে এখনো কারফিউ রয়েছে—এ কথাটিও তিনি প্রায় ভুলে গিয়েছিলেন বলে জানান।
মৃদু আবহাওয়া এবং পাহাড়জুড়ে বিস্তৃত আঙুরের বাগানের জন্য পরিচিত জাকারপট্টিয়া এখন কিরেইয়েভার কাছে ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের তিনি বন্ধুত্বপূর্ণ, ভালো ও আন্তরিক বলে প্রশংসা করেন।
‘এটা হতাশাজনক’
বেরেহোভ অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দা ৪১ বছর বয়সী তেতিয়ানা দুব বলেন, বর্তমানে এটি এমন একটি জায়গা “যেখানে মানুষ কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পেতে পারে।”
তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, আমাদের দেশের মানুষ এখানে নিরাপদে আসতে পারেন এবং মানসিক শান্তির পাশাপাশি আবেগগত ও মানসিক স্বস্তিও পেতে পারেন।”
তেতিয়ানা যখন এ কথা বলছিলেন, তখন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও নিহত সেনাদের স্বজনেরা যুদ্ধে নিহত বেরেহোভের বাসিন্দাদের স্মরণে একটি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
নিহত সেনাদের স্মরণে নির্মিত একটি স্মৃতিস্তম্ভের পাশে ইউক্রেনের নীল-হলুদ পতাকা প্রদর্শন করা হয়। পাশে একটি ফুলদানিতে রাখা হয় সূর্যমুখীর তোড়া। সূর্যমুখী ইউক্রেনের জাতীয় ফুল এবং আশার প্রতীক।
অনুষ্ঠানে বাখমুতের যুদ্ধে নিহত ওই অঞ্চলের এক বাসিন্দার স্মরণে একটি স্মারকফলক স্থাপন করা হয়। তাঁর মরদেহ কখনো বাড়িতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
পুরোহিতেরা নিহতদের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করার সময় বাতাসে ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। নিহতদের আত্মার জন্য তারা প্রার্থনা করেন, “হে প্রভু, আমাদের রক্ষাকারীদের প্রতি দয়া করুন।” গ্রীষ্মের শেষভাগের প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে প্রায় ১০০ জন বাসিন্দা শহরের প্রধান চত্বরে জড়ো হন।
তখন সেখানে তাৎক্ষণিক কোনো হামলার আশঙ্কা ছিল না, যার কারণে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটতে হতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাব শহরটির মানুষের জীবন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি।
তেতিয়ানা দুব বলেন, “শারীরিকভাবে যুদ্ধ এখানে নেই, কিন্তু মানসিকভাবে এটি হতাশাজনক। কারণ সামনে কীভাবে এগোব, এরপর কী হবে এবং এই যুদ্ধ আর কতদিন চলবে—তা বোঝা কঠিন।”
তবে তিনি বলেন, “আমি দেখছি, আমাদের মানুষ লড়াই করে টিকে আছে এবং হাল ছেড়ে দেয়নি। আর সে কারণেই আমরা বিশ্বাস করি, শেষ পর্যন্ত সবকিছু ভালো হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন