প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
৭ লাখ ৯০ হাজার কোটির বাজেট, অথচ খবরে প্রকাশ, প্রথম ছয় মাসেই রাঘব বোয়ালদের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি —গত তিন মাসে এর ব্যবধান বেড়েছে ১৮ হাজার ৫ শত ৫৫ কোটি টাকা! আর নতুন এই পে স্কেলে সরকারের অতিরিক্ত খরচ হবে সেই তুলনায় মাত্র ১৩.৪% যার পরিমাণ ১ লক্ষ ৬ হাজার কোটি টাকা, তবু পে-স্কেলে এত হিসাব কেন? এই পে স্কেল কি সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা দায়িত্বরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তুষ্ট করবে নাকি তাদের মধ্যে অসন্তুষ্টির বীজ বপন করবে-?
রাষ্ট্রের চালকের আসনে যারা, তাদের বেতন কি রাষ্ট্রের কাছে ব্যয়—আর রাঘব বোয়ালদের খেলাপি ঋণ কি কেবল পরিসংখ্যান? বাংলাদেশের ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। আর গত ছয় মাসেই দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা—এমন একটি অঙ্ক এখন গণমাধ্যমের মাধ্যমে গণ আলোচনায় ঘুরছে। দুটি সংখ্যা পাশাপাশি রাখুন।
একটি পুরো দেশের এক বছরের জাতীয় বাজেটের আকার। অন্যটি তার প্রায় ৭৭ শতাংশের সমান খেলাপি ঋণের পাহাড়। এবার আরেকটি সংখ্যা সামনে আনুন। নবম জাতীয় পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
এখন প্রশ্নটি করা যাক—বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা কি সত্যিই সরকারি শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন? নাকি সমস্যাটি কোথায় রাষ্ট্র তার অর্থ খরচ করে, কাকে ছাড় দেয় এবং কার কাছ থেকে পাওনা আদায়ে কঠোর হয়—সেই অগ্রাধিকারে? প্রশ্নটি অস্বস্তিকর। কিন্তু সময়ের দাবি বলেই প্রশ্নটি করতেই হবে।
৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা—এটি কি শুধুই একটি সংখ্যা? খেলাপি ঋণের অঙ্ক যখন ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছে, তখন সেটিকে নিছক একটি ব্যাংকিং পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কারণ ব্যাংকের টাকা আকাশ থেকে আসে না। সেখানে মানুষের আমানত আছে, ব্যবসার অর্থ আছে, বিনিয়োগের অর্থ আছে, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির সঞ্চালন আছে। ঋণ দেওয়া হয় অর্থনীতিকে সচল করার জন্য—শিল্প হবে, কর্মসংস্থান হবে, ব্যবসা বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে, কর আসবে। কিন্তু সেই অর্থ যদি ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়া হয়, তখন ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত কে বহন করে? ব্যাংক? আমানতকারী? সরকার? নাকি সাধারণ মানুষ?
শেষ পর্যন্ত এর অভিঘাত পড়ে গোটা অর্থনীতির ওপর।আর এখানেই প্রশ্নটি আরও তীক্ষ্ণ হয়—
যে দেশে লাখ লাখ কোটি টাকার ঋণ অনাদায়ী হয়ে পড়ে থাকতে পারে, সেই দেশে একজন সরকারি শিক্ষক বা কর্মচারীর বেতন বাড়াতে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত লাগবে—এই অঙ্কটি কি সত্যিই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক দুশ্চিন্তা হওয়া উচিত?
পে-স্কেল: বেতন নয়, রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের পরীক্ষা
নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরি জীবীদের প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এর শুধুমাত্র গেজেট প্রকাশের জন্য বাকি থাকা পে-স্কেলের কাজটি নতুন সরকার আসার পর আবারো নতুন করে শুরু করে শেষ করতে বিগত ছয় মাস ধরে আলোচনা, সভা, বৈঠক, কমিশন, দেনদরবার—সব মিলিয়ে মনে হয়েছে, একটি কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত যেন নাগালের বাইরে থাকা কোনো ‘সোনার হরিণ’। অবশেষে যখন এর সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে আলোচনা সামনে আসছে, তখন আনন্দের পাশাপাশি প্রশ্নও তৈরি হচ্ছে।
মূল বেতন বাড়বে। বেতন কাঠামো বড় হবে। কোথাও ১০০ শতাংশ, কোথাও ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির কথা আলোচনায় আসছে। কিন্তু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সুস্পষ্ট কোন বার্তা দেয়া হয়নি এমনকি কবে থেকে এটি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাউন্টে ঢুকবে সে সম্পর্কে কিছু পরিষ্কার বলা হয়নি। যদি ধাপে ধাপে হয়, কিছু সুবিধা কয়েক বছর পিছিয়ে যায়, আর পুরো কাঠামোর সুফল পেতে ২০২৮–২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়—তাহলে প্রশ্ন থাকবেই:
ঘোষণার অঙ্ক বড়, নাকি মানুষের হাতে পৌঁছানো অর্থের মূল্য বড়? পে স্কেল বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট বিষয়টি পরিষ্কার না হলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে অস্পষ্টতার ভিত্তিতে প্রকাশিত বিষয় থেকে যতদূর বোঝা যায় তাতে মনে হচ্ছে, সরকার ২০২৬ ও ২০২৭ দুই বছরে মূল স্কেল বৃদ্ধির অর্থ তিন ধাপে প্রদান করবে অথবা অন্য কিছু। এবং এই সময়ে ইতিমধ্যেই তাদের প্রাপ্ত মূল স্কেলের অতিরিক্ত সুবিধা গুলো পরবর্তী ২০২৯ সাল নাগাদ প্রদান করে তা সম্পূর্ণ করবে। এখন প্রশ্ন হল, যা দীর্ঘ ১১ বছর প্রতীক্ষার পর যা প্রদান করা হচ্ছে তা কি এই ধাপে ধাপে প্রদানের বিষয়টির কারণে তা তাদের সন্তুষ্টির কারণ হবে নাকি তীব্র অসন্তুষ্টির মাত্রা আরও বাড়াবে?
একজন সরকারি কর্মচারী শতাংশ দিয়ে বাজার করেন না।তিনি চাল কেনেন টাকায়।বাড়িভাড়া দেন টাকায়।সন্তানের স্কুল-কলেজের খরচ দেন টাকায়।
চিকিৎসার বিল দেন টাকায়। যাতায়াতের খরচ দেন টাকায়। তাই পে-স্কেলের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে কাগজে কত শতাংশ বেতন বাড়ল দিয়ে নয়; বরং মূল্যস্ফীতির পর একজন কর্মচারীর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়ল—তা দিয়ে।
সরকারের কাছে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা বড়—কিন্তু কার কাছে? ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা নিঃসন্দেহে বিপুল অর্থ। কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কোনো অঙ্ককে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করা যায় না।
৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ যদি সরকারি কর্মকর্তা -কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রশ্ন হতে পারে—এই ব্যয় কি রাষ্ট্রের জন্য বোঝা, নাকি বিনিয়োগ?
কারণ এই কর্মচারীরাই রাষ্ট্রের দৈনন্দিন চাকা ঘোরান।শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যান।চিকিৎসক হাসপাতালে যান। প্রকৌশলী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। প্রশাসনের কর্মকর্তা মাঠে কাজ করেন। কৃষি কর্মকর্তা কৃষকের পাশে দাঁড়ান।
পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করেন। রাজস্ব কর্মকর্তা রাষ্ট্রের আয় সংগ্রহ করেন। রাষ্ট্রের এই বিশাল মানবসম্পদকে আমরা যদি শুধু ‘বেতনভোগী’ হিসেবে দেখি, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনেই ভুল থেকে যায়। তারা রাষ্ট্রের খরচ নন; তারা রাষ্ট্রের কার্যক্ষমতার অংশ।তাহলে দরকষাকষি কেন?
এখানেই সাধারণ মানুষের প্রশ্নটি সবচেয়ে যৌক্তিক।
একদিকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি। অন্যদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, অনিয়ম, অপচয় কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ। আর অন্যদিকে রাষ্ট্রের নিয়মিত কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ের প্রশ্নে এত দীর্ঘ হিসাব -নিকাশ!
তখন প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্র কি ভুল জায়গায় মিতব্যয়ী?
যদি অর্থনৈতিক সংকট থাকে, সেটি সবাইকে স্বীকার করতে হবে। কিন্তু সেই সংকট মোকাবিলায় প্রথম আঘাত কি পড়বে শুধু নিয়মিত বেতনভোগী মধ্যবিত্তের ওপর?কেন একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠবে না—
কত টাকা কর ফাঁকি যাচ্ছে?কত টাকা পাচার হচ্ছে?
কত টাকা খেলাপি ঋণের কারণে আটকে আছে?
কত প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হচ্ছে?কত সরকারি সম্পদ অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় নষ্ট হচ্ছে?কত অর্থনৈতিক সুবিধা যোগ্যতার বদলে প্রভাবের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে?
রাষ্ট্র যদি এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে শুধু বেতন বাড়ানোর সময় ‘টাকা নেই’ বলে, তাহলে সেই যুক্তি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে—এমন সরল সমীকরণও একেবারে সঠিক নয় তবে দীর্ঘ ১১ বছরের ব্যবধানে প্রয়োজন অনুযায়ী তাদেরকে প্রয়োজনীয় বেতন ভাতা না দেওয়াটাও সে অপরাধের কারণ হতে পারে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। শুধু পে-স্কেল বাড়ালেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতিমুক্ত হয়ে যাবেন—এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজন কঠোর আইন, কার্যকর প্রয়োগ, জবাবদিহি, সম্পদের হিসাব, স্বচ্ছতা এবং দ্রুত বিচার।কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি নৈতিক দায়িত্বও আছে।
যে রাষ্ট্র তার কর্মচারীর কাছ থেকে সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠা দাবি করে, সেই রাষ্ট্রকে তার কর্মচারীর ন্যায্য জীবনযাত্রার নিশ্চয়তাও দিতে হবে। একজন শিক্ষককে সম্মানজনক বেতন দিয়ে তারপর তার কাছে সর্বোচ্চ পেশাগত দায়িত্ব দাবি করা যৌক্তিক।
একজন সরকারি কর্মকর্তাকে প্রতিযোগিতামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ বেতন দিয়ে তারপর তার কাছ থেকে ঘুষের বিরুদ্ধে অবস্থান আশা করা যৌক্তিক।
অন্যদিকে বেতন এমন পর্যায়ে আটকে রেখে শুধু নৈতিকতার বক্তৃতা দিলে রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানও দুর্বল হয়।
১৪২ শতাংশ শুনতে চমৎকার—কিন্তু বাস্তবে কত?
পে-স্কেলের সম্ভাব্য বৃদ্ধির হার নিয়ে ১০০ শতাংশ বা কোথাও ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত আলোচনার কথা সামনে আসছে। শুনতে চমকপ্রদ। কিন্তু এখানে আরেকটি বাস্তবতা ভুললে চলবে না—বেতন বাড়ার সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে। যদি একজন কর্মচারীর বেতন দ্বিগুণ হয়, কিন্তু একই সময়ে তার বাসাভাড়া, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে তার প্রকৃত জীবনমান কতটা বাড়ল?
সুতরাং পে-স্কেল ঘোষণার সময় শুধু ‘বেতন কত শতাংশ বাড়ল’ বলা যথেষ্ট নয়। সরকারকে বলতে হবে—মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর একজন কর্মচারীর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কত বাড়বে? এই প্রশ্নের উত্তরেই পে-স্কেলের প্রকৃত সাফল্য লুকিয়ে আছে। সরকারের ভাবমূর্তির প্রশ্নটিও ছোট নয়।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যদি এমন একটি পে-স্কেল আসে, যার বড় অংশ ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে, কিছু সুবিধা পরে আসবে, আর মূল্যস্ফীতি এরই মধ্যে বর্ধিত বেতনের বড় অংশ খেয়ে ফেলবে—তাহলে এটি সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবেও সুখকর নাও হতে পারে। কারণ প্রত্যাশা যত বেশি, হতাশার সম্ভাবনাও তত বেশি।
সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা যদি মনে করেন, তাদের দীর্ঘদিনের দাবিকে বাস্তব সমাধানের বদলে কিস্তি, ধাপ, শর্ত ও বিলম্বের মধ্যে আটকে দেওয়া হয়েছে, তাহলে একটি ইতিবাচক ঘোষণা উল্টো অসন্তোষের কারণ হতে পারে। পে-স্কেল তখন আর শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে সরকারের প্রতি আস্থার প্রশ্ন।
রাষ্ট্রের চালকের আসনে যারা, তাদেরই যদি জ্বালানি না থাকে? রাষ্ট্রকে একটি গাড়ি হিসেবে কল্পনা করা যাক। সরকার হলো চালকের আসনে। কিন্তু গাড়ি চালানোর জন্য শুধু চালক থাকলেই হয় না। প্রয়োজন ইঞ্জিন, জ্বালানি, যন্ত্রাংশ এবং দক্ষ কর্মী।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেই ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। তাদের দক্ষতা, সততা ও কর্মস্পৃহা ছাড়া রাষ্ট্রের কোনো নীতি বাস্তবায়িত হবে না।
তাহলে তাদের ন্যায্য বেতন-ভাতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র যদি বারবার পিছিয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই।
রাষ্ট্র কি গাড়ির বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়ে বেশি চিন্তিত, নাকি ইঞ্জিন সচল রাখার ব্যাপারে? এখন দরকার সাহসী সিদ্ধান্ত।সরকারের উচিত পে-স্কেল নিয়ে অযথা দীর্ঘসূত্রতা না করা।
একটি বাস্তবসম্মত, মূল্যস্ফীতিসংবেদনশীল এবং দীর্ঘমেয়াদি বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা দরকার। কিন্তু একই সঙ্গে সরকারকে অর্থের উৎসও দেখাতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হতে হবে। কর ফাঁকি বন্ধ করতে হবে। করজাল বাড়াতে হবে।
অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ও অপচয় কমাতে হবে।
দুর্নীতি ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি টাকার ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে।
তাহলেই জনগণও বুঝবে—সরকার বেতন বাড়াচ্ছে শুধু কর্মচারীদের খুশি করতে নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে। শেষ প্রশ্নটি তাই খুব সহজ। ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট করতে পারে যে রাষ্ট্র, ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করতে বাধ্য হয় যে অর্থনীতি, সে রাষ্ট্র কি সত্যিই তার শিক্ষক -কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে অক্ষম? হয়তো অর্থনৈতিক বাস্তবতা জটিল। হয়তো পুরো অর্থ এক বছরে জোগাড় করা কঠিন। হয়তো ধাপে বাস্তবায়নের প্রয়োজন আছে।
কিন্তু জনগণ এবং সরকারি চাকরিজীবীদের সামনে অন্তত একটি সৎ হিসাব থাকা দরকার। কোথায় টাকা নেই—তা নয়; কোথায় টাকা যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে এবং কার কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে না—সেই হিসাবটিও প্রকাশ্যে আসতে হবে। কারণ একজন সরকারি শিক্ষক বা কর্মচারীর বেতন রাষ্ট্রের জন্য ‘অতিরিক্ত বোঝা’ হলে, রাঘব বোয়ালদের খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রের জন্য কী? একজন কর্মচারীর বেতন বাড়াতে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যদি রাষ্ট্রের এত মাথাব্যথা হয়, তাহলে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের দায় নিয়ে রাষ্ট্রের মাথাব্যথা কতটা—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
পে-স্কেল তাই শুধু বেতন বাড়ানোর বিষয় নয়।
এটি রাষ্ট্র কার পাশে দাঁড়ায়—তারও একটি পরীক্ষা।
রাষ্ট্র কি সেই মানুষের পাশে দাঁড়াবে, যারা প্রতিদিন রাষ্ট্রকে সচল রাখে?
নাকি আবারও প্রমাণ হবে—ক্ষমতাবানদের জন্য রাষ্ট্রের দরজা প্রশস্ত, আর নিয়মিত বেতনভোগীদের জন্য হিসাবের খাতা দীর্ঘ? নবম পে-স্কেল সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার একটি বিরাট সুযোগ। এবার সিদ্ধান্ত শুধু বেতন বাড়ানোর নয়—রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার ঠিক করার এমন কথা বলা মনে হয় অমূলক হবে না।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন