প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশ তার সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে; কারও নাক গলানো হবে শিষ্টাচারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি বাস্তবতা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—বাংলাদেশ আর সেই রাষ্ট্র নয়, যাকে পুরোনো মানসিকতার চশমা দিয়ে দেখা যাবে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেরও বেশি সময় পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা কৌশল নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশের প্রতিটি সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে "প্রতিবেশীর অনুমোদনসাপেক্ষ" বলে ধরে নেওয়ার যুগ শেষ হয়ে এসেছে।
অনেক বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে কিছু প্রতিবেশী দেশ প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে মন্তব্য করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ম একটাই—সার্বভৌম রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত সেই রাষ্ট্রই নেবে। অন্য কোনো দেশের প্রত্যাশা বা অস্বস্তি সেই সিদ্ধান্তের মাপকাঠি হতে পারে না।
আজকের বাংলাদেশ কেবল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রাষ্ট্র। বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী। ফলে বাংলাদেশের কূটনীতি এখন বহুমাত্রিক। এক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই অন্য দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান—এমন সেকেলে ধারণা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আর কার্যকর নয়।
যে রাষ্ট্র নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, সে রাষ্ট্র কখনো একক নির্ভরশীলতার ফাঁদে আটকে থাকে না। বরং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে। বাংলাদেশের জন্যও সেটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। কারণ জাতীয় স্বার্থ কোনো স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী প্রতিপক্ষকে চেনে না; চেনে কেবল স্থায়ী স্বার্থকে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব অবশ্যই কাম্য। কিন্তু বন্ধুত্ব কখনো আধিপত্যের সমার্থক হতে পারে না। সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির ওপর যে সম্পর্ক দাঁড়ায়, সেটিই দীর্ঘস্থায়ী হয়। অন্যদিকে, যদি কেউ মনে করে বাংলাদেশের প্রতিটি সিদ্ধান্তে তাদের মতামতই শেষ কথা হবে, তবে সেটি কূটনৈতিক বাস্তবতার নয়, অতীতের মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশের জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা দেখতে চায় এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি, যা কোনো একক শক্তির প্রভাববলয়ে আবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলগত স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। এই নীতিই বাংলাদেশকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত হলো—প্রতিটি রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে নিঃশর্তভাবে সম্মান করা। বাংলাদেশ যেমন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের নীতি সমর্থন করে না, তেমনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বা সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিয়ে অযাচিত চাপ বা মন্তব্যও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে তার কূটনৈতিক পরিসর বিস্তৃত হচ্ছে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে। এই বহুমাত্রিক সম্পর্ককে সংকীর্ণ প্রতিযোগিতার চোখে দেখা ভুল হবে। কারণ একটি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ কারও বিরুদ্ধে নয়; বরং নিজের স্বার্থের পক্ষে।
যারা এখনো মনে করেন, বাংলাদেশের প্রতিটি পদক্ষেপে তাদের "নাক গলানোর" পুরোনো অভ্যাস বহাল থাকবে, তাদের উপলব্ধি করা উচিত—এটি আর আগের বাংলাদেশ নয়। স্বাধীন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত স্বাধীন রাষ্ট্রই নেবে। পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব টিকে থাকে; আধিপত্যের মানসিকতা শেষ পর্যন্ত কেবল অবিশ্বাসই সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কোনো দরকষাকষির বিষয় নয়। এটি জনগণের অর্জন, সংবিধানের অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রশ্ন। সেই মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশের, আর সেই মর্যাদাকে সম্মান করার দায়িত্ব প্রতিবেশীসহ সকল অংশীদার রাষ্ট্রের।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন