প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
‘ভ্যানটা পাওয়া গেছে, ছেলের জুতা পাওয়া গেছে—কিন্তু আমার ছেলেডারে তো পাই নাই। প্রতিদিন মনে হয়, এই বুঝি দরজায় এসে দাঁড়াবে ইমরান। আবার ভয় হয়, কোনো অঘটন ঘটেনি তো!’—এভাবে ফরিদপুরের সালথা উপজেলার ভাওয়াল ইউনিয়নের ইউসুফদিয়া ভদ্রপাড়া গ্রামের চুন্নু খান ও হাজেরা বেগম দম্পতির দিন কাটছে, যাঁরা ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইমরান খানকে হারিয়েছেন। নিখোঁজের আড়াই মাস অতিক্রান্ত হলেও এখনো পর্যন্ত ইমরানের সন্ধান মেলেনি।
বাবা-মা সন্তানের জীবিত থাকার আশা নিয়ে দিন গুনছেন। তাঁরা চান, যদি কোনো অঘটন ঘটে থাকে, অন্তত ছেলের শেষ পরিণতি সম্পর্কে জানতে।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ জুন ধান ভাঙানোর কথা বলে প্রতিবেশী শামীম মোল্যা (২১) চুন্নু খানের ব্যাটারিচালিত ভ্যান নিয়ে বের হয়ে যায়। এরপর থেকেই নিখোঁজ হয় ইমরান। ওই দিন সকাল থেকে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন, কিন্তু কোথাও তার সন্ধান মেলেনি।
স্বজনদের অভিযোগ, শামীম মোল্যার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইমরানের অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কথা বলেন। এর ফলে পরিবারের সন্দেহ আরও বাড়তে থাকে। ঘটনার তিন দিন পর ১৭ জুন বিকেলে পাশের মাঝারদিয়া ইউনিয়নের কুমারপট্টি গ্রামের এলিনা বেগমের বাড়ি থেকে ইমরানের ব্যবহৃত ব্যাটারিচালিত ভ্যানটি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে একটি পাটখেত থেকে তার ব্যবহৃত জুতা ও একটি কোদালও উদ্ধার করা হয়। তবে এসব আলামত উদ্ধারের পরও ইমরানের সন্ধান মেলেনি।
ইমরানের বাবা চুন্নু খান ওই দিনই সালথা থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার তদন্তে এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন জামিনে রয়েছেন এবং দুজন বর্তমানে কারাগারে আছেন। তবে মামলার প্রধান অভিযুক্ত শামীম মোল্যা এখনো পলাতক রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ইমরানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারটি জরাজীর্ণ একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছে। দীর্ঘ সময় ধরে সন্তান নিখোঁজ থাকায় পরিবারের সদস্যদের চোখেমুখে উদ্বেগ ও হতাশার ছাপ স্পষ্ট। ছেলের ছবি হাতে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইমরানের বাবা-মা।
চুন্নু খান বলেন, ‘আড়াই মাস ধইরা আমার ছেলের কোনো খোঁজ নাই। সে বাঁচে আছে নাকি মারা গেছে, কিছুই জানি না। আমরা গরিব মানুষ। ছেলেডারে খুঁজতে কত জায়গায় ঘুরছি। আমার ছেলেডা যদি বাঁচে থাকে, তারে ফিরাইয়া দেন। আর যদি কোনো অঘটন হইয়া থাকে, হাড্ডি-গুড্ডি হইলেও খুঁইজ্যা দ্যান।’
ইমরানের মা হাজেরা বেগম বলেন, ‘ভ্যানটা পুলিশ উদ্ধার করছে, কিন্তু আমার ছেলেডারে পাই নাই। ছেলেকে খুঁজতে ফরিদপুর হাসপাতাল, মুকসুদপুর হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় গেছি। কোথাও তার সন্ধান পাইনি। প্রতিদিন মনে হয়, আজ বুঝি আমার ছেলে ফিরে আসবে।’
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মামলার দিনই মাঝারদিয়া ইউনিয়নের কুমারপট্টি গ্রাম থেকে এনায়েত শেখের স্ত্রী এলিনা বেগমকে (৩২) আটক করা হয়। তাঁর বাড়ি থেকেই ইমরানের ব্যবহৃত ভ্যানটি উদ্ধার হয়। একই দিনে শামীম মোল্যা আত্মগোপনে চলে যায়। পরে তাঁর বাবা টুকু মোল্যা (৬৫) ও স্ত্রী সাথী বেগমকে (২১) আটক করা হয়। তদন্তের ধারাবাহিকতায় মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মুরুটিয়া গ্রাম থেকে রাসেল মাতুব্বর (২১) নামের আরো এক যুবককে আটক করা হয়। পরে তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবলুর রহমান খান বলেন, ইমরান নিখোঁজের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। এ মামলায় এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের কয়েকজন জামিনে রয়েছেন এবং দুজন কারাগারে আছেন। মামলার প্রধান অভিযুক্ত শামীম মোল্যা পলাতক। তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ওসি আরো বলেন, শামীম মোল্যাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে ইমরান নিখোঁজের রহস্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে বলে আশা করছে পুলিশ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন