প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকঢোল, কাঁশি-ঠিকারির বাদ্য, জারি-সারি গানের সুর এবং হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার কালিগঞ্জ। সোমবার (২৬ অক্টোবর) বর্ণিল আয়োজনে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী ‘বিল বাঘিয়ার নৌকাবাইচ’, যা আবহমান বাংলার দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য ধারণ করে। স্থানীয় মাঝি-মাল্লাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই লোকজ উৎসব বছরের পর বছর ধরে টিকে আছে, কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজক কমিটি কিংবা পুরস্কারের ব্যবস্থা ছাড়াই।
নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে কালিগঞ্জে বসেছে হাজারো মানুষের মিলনমেলা। কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ী ইউনিয়নের বাবুর খালে, কালিগঞ্জ বাজার থেকে খেজুরবাড়ি পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে এই প্রতিযোগিতা ও মেলা। গোপালগঞ্জ ছাড়াও মাদারীপুর, পিরোজপুর ও বরিশালের বিভিন্ন এলাকার প্রতিযোগীরা সরেঙ্গা, ছিপ, কোষা, চিলাকাটা ও জয়নগর বাচারী নৌকা নিয়ে এতে অংশগ্রহণ করছেন।
সোমবার দুপুরে শুরু হওয়া নৌকা বাইচ চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। নানা রঙে ও বিচিত্র সাজে সজ্জিত বিশাল নৌকাগুলো যখন খালের বুকে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যায়, তখন দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বৈঠার ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ, মাঝিদের সমবেত হাঁকডাক এবং দর্শকদের করতালি ও হর্ষধ্বনিতে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
ঠিকারি ও কাঁশির বাদ্যের তালে জারি-সারি গানের সুর, মাঝিদের ছন্দময় বৈঠা চালানো এবং ‘হেঁইয়ো হেঁইয়ো’ ধ্বনিতে ফুটে ওঠে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ। নৌকা বাইচ ঘিরে বসেছে মেলাও। দূর-দূরান্ত থেকে আসা নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় উৎসবস্থল পরিণত হয়েছে আনন্দের মিলনমেলায়।
প্রাচীন বাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধারণ করে চলা এই নৌকাবাইচ শুধুমাত্র প্রতিযোগিতা নয়; এটি কোটালীপাড়ার মানুষের আবেগ, ভালোবাসা এবং শেকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক প্রাণের উৎসব।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দ্বিতীয় দিনেও দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে নৌকাবাইচ। বুধবার (২৮ অক্টোবর) তৃতীয় ও শেষ দিন দুপুরে শুরু হয়ে সন্ধ্যায় শেষ হবে তিন দিনের এই উৎসব। এরপরই ভাঙবে হাজারো মানুষের মিলনমেলা।
কোটালীপাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল বশার হাওলাদার বলেন, তিনি ছোটবেলা থেকেই এই নৌকা বাইচ দেখে আসছেন। এখানে কাউকে বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে আয়োজন করতে হয় না। মাঝি-মাল্লারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নৌকা নিয়ে এসে বাইচে অংশ নেন। কোনো আয়োজক কমিটি নেই, পুরস্কারের ব্যবস্থাও নেই। তারপরও প্রায় ২০০ বছর ধরে এই উৎসব চলে আসছে। এটি কোটালীপাড়ার নিজস্ব ঐতিহ্য। সব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
নৌকাবাইচ দেখতে আসা শিক্ষার্থী পলাশ বাড়ৈ, শান্তা ইসলাম, আহমদ আলী, ফরিদ শেখ, অনন্যা হালদার, প্রিয়ন্তি রায় পিউ এবং গৃহবধূ জ্যোৎস্না অধিকারী বলেন, তাঁরা জীবনে অনেক জায়গায় নৌকাবাইচ দেখেছেন। তবে এখানকার মতো এত বড়, রঙিন ও রাজকীয় ঢঙের নৌকা বাইচ আর কোথাও দেখেননি। তাঁদের ভাষায়, বাইচ দেখে মন জুড়িয়ে যায়। নৌকাবাইচে যে এত আনন্দ, তা না দেখলে বোঝা যায় না।
নৌকা বাইচে অংশ নেওয়া কোটালীপাড়া উপজেলার নৈয়ারবাড়ি গ্রামের সুকমল সরকার বলেন, তিন দিনের এই নৌকাবাইচে অংশ নিয়ে তাঁরা দর্শনার্থীদের আনন্দ দেন এবং নিজেরাও আনন্দ উপভোগ করেন। শত শত বছর ধরে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা এই উৎসবে অংশ নিয়ে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মও এই ঐতিহ্য ধরে রাখবে বলে আশা করেন তিনি।
আরেক মাল্লা অতুল বাড়ে বলেন, আগে বিলে নৌকা বাইচ হতো। এখন বিলে পানি না থাকায় খালে বাইচ হয়। খাল যত দিন টিকে থাকবে, তত দিন নৌকাবাইচও টিকে থাকবে। তাই এই ঐতিহ্য রক্ষায় বাবুর খাল সংরক্ষণ করা জরুরি।
কলাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট বিজন বিশ্বাস বলেন, নদীমাতৃক এই অঞ্চলের ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাঘিয়া বিলের নৌকা বাইচ তাঁদের গর্ব। আবহমান গ্রামবাংলার প্রাচীন কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও স্বকীয়তা ধরে রাখতে হবে। এই ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
গোপালগঞ্জ উদীচীর সভাপতি নাজমুল ইসলাম বলেন, দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং প্রাণের উচ্ছ্বাসে বিল বাঘিয়ার নৌকা বাইচ প্রমাণ করে, বাংলার লোকজ সংস্কৃতি মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীরভাবে প্রোথিত। বাবুর খালের ঢেউয়ে বৈঠার ছন্দ যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিন কোটালীপাড়ার এই ঐতিহ্যবাহী আনন্দ উৎসবও টিকে থাকবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন