প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া জনআকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা পূরণে সরকার এবং বিরোধী দল—দুজনেই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগের অভাবের কারণে জাতীয় ঐক্যের মধ্যে বিভাজন তৈরি হচ্ছে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে মঞ্চ ২৪ আয়োজিত ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির অনৈক্য ও বাংলাদেশের ক্ষতি’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির আন্দোলন ছিল না। এতে অংশ নিয়েছেন বিচারক, সচিব, পুলিশ কর্মকর্তা, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, রিকশাশ্রমিক এবং শিক্ষার্থী—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। গুলি, হেলিকপ্টার ও সাঁজোয়া যান সামনে থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা রাজপথে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও ছিলেন।
তিনি বলেন, এই আন্দোলনের মাধ্যমে যে জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছিল, সেখানে অনৈক্যের সুযোগ থাকা উচিত নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে; তবে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রশ্নে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তাজুল ইসলাম বলেন, মানুষের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা পরিচালিত হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিপীড়ন, হত্যাকাণ্ড কিংবা হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের কাজে ব্যবহার করা হবে না। নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হবে না এবং রাষ্ট্র দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে সুশাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার ও বিরোধী দল এটি বাস্তবায়নে সম্মত হয়ে স্বাক্ষর করেছে। এখন মূল মতপার্থক্য বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে। তবে জনগণ কোন পদ্ধতিতে এটি বাস্তবায়ন হবে, সেটিকে মুখ্য মনে করে না। তারা জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটে দেওয়া রায়ের বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তন হবে, নাকি সংস্কারের মাধ্যমে—এটি জনগণের কাছে বড় বিষয় নয়। তারা দেখতে চায়, সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে জনগণের সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন, সংসদ কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করছে এবং রাষ্ট্রের কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এসেছে।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচারের ধারণা সামনে রেখে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব বিচার দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রধান অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা না গেলে সমাজে প্রকৃত স্বস্তি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। কারা এবং কীভাবে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল, কোন বাহিনী বা প্রতিষ্ঠান এতে ভূমিকা রেখেছিল—এসব তথ্য যথাযথভাবে নথিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করতে হবে।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাস পরেও কাঙ্ক্ষিত সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ তৈরি হতে পারে উল্লেখ করে তাজুল ইসলাম বলেন, যারা ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও হেলিকপ্টারের সামনে বুক পেতে জীবন দিয়েছেন, তারা প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার না হলে হতাশ হবেন। সেই ক্ষোভ বাড়তে থাকলে আবারও আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
রাষ্ট্র সংস্কারে সরকারের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বলেন, সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না এবং বিভিন্ন সমস্যার কার্যকর সমাধানেও ব্যর্থ হচ্ছে।
সংসদ সদস্যদের ভূমিকার সমালোচনা করে তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোন প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হয়েছিল, তা অনেক সংসদ সদস্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি।
বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক বিরোধিতা করা এবং বিকল্প পথ তুলে ধরা বিরোধী দলের দায়িত্ব। কিন্তু তারাও এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন না। ফলে সরকার ও বিরোধী দল—দুই পক্ষই জনগণের গণআকাঙ্ক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ে প্রায় দুই হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ১৭ বছরের গুম, নিখোঁজ, মামলা ও কারাবরণের ইতিহাস। এসব ত্যাগের কথা মনে রেখে সরকার ও বিরোধী দলকে জাতীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে। অন্যথায় কঠিন পরিণতি অপেক্ষা করতে পারে।
জুলাইয়ের শহীদ ও নিখোঁজদের পরিবারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সন্তান হারানো পরিবারের বেদনা এবং গুম হয়ে যাওয়া স্বজনের অপেক্ষায় থাকা মানুষের কষ্ট ভুলে গেলে রাষ্ট্র তার পথ হারাবে। জুলাইয়ের শহীদদের স্বপ্ন ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
সেমিনারে মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকীর সভাপতিত্বে সংগঠনটির উপদেষ্টা ডিউক হুদা, ড. ফয়জুল হক, লে. কর্নেল ফেরদৌস আজিজ, শেখ মহিউদ্দিন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, সাবেক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন