প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আগামীকাল হাইকোর্টের শুনানির জোর প্রস্তুতি চলছে
সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে বিষয়টি অবহিত করবে মানবাধিকার সংগঠন:
মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টপ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে মাসব্যাপী মেলা আয়োজনকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ও প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনসংক্রান্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সরকারি প্রজ্ঞাপন এবং হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার অনুলিপি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানোর পরও কীভাবে ওই মাঠে মেলার অনুমোদন দেওয়া হলো, তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে একটি মানবাধিকার সংগঠন। সংগঠনটির প্রশ্ন, সরকারি নির্দেশনা ও আদালতের আদেশ সম্পর্কে লিখিতভাবে অবহিত হওয়ার পরও কোন আইনি ক্ষমতাবলে জেলা প্রশাসন এ অনুমোদন দিয়েছে?
এ ঘটনায় আগামীকাল রোববার (১ নভেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ১১ নম্বর বেঞ্চে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ জানিয়েছে। একই দিন বিষয়টি সরকারের নজরে আনতে মানবাধিকার সংগঠনটির প্রতিনিধিরা সচিবালয়ে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে অবহিত করার পরিকল্পনা করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জয়মন্টপ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে হস্ত ও কুটিরশিল্পজাত পণ্যের মাসব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। গত ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে মেলাটির উদ্বোধন করা হয়। মেলা আয়োজনে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানা গেছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে বাণিজ্যিক মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকারি বিধিনিষেধ ও আদালতের আদেশের বিষয়টি সামনে আসার পর জেলা প্রশাসনের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনটির দাবি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের ২৯ জুন জারি করা ‘মেলা পরিপত্র, ২০২২’-এর ৫(চ) ধারায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজনের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হাইকোর্টের একটি নিষেধাজ্ঞার অনুলিপিও সংগঠনটির কাছে রয়েছে। ওই সরকারি পরিপত্র ও আদালতের আদেশের অনুলিপি সংযুক্ত করে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে একাধিকবার লিখিত আবেদন ও অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
এ অবস্থায় মানবাধিকার সংগঠনটির সরাসরি প্রশ্ন, সরকারি প্রজ্ঞাপন ও হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার অনুলিপি হাতে পাওয়ার পরও জেলা প্রশাসন কোন আইনি ভিত্তিতে বিদ্যালয়ের মাঠে মাসব্যাপী মেলার অনুমোদন দিয়েছে? আদালতের আদেশ এবং সরকারের জারি করা নির্দেশনার বিষয়টি অবগত হওয়ার পরও যদি সেই নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এর প্রশাসনিক ও আইনগত দায়ভার কার? সরকারি বিধিনিষেধের বাইরে গিয়ে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জেলা প্রশাসনকে কে দিয়েছে?
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো লিখিত আবেদনগুলোতে শুধু মেলা আয়োজনের বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়নি; বরং সরকারি পরিপত্র ও আদালতের আদেশের আলোকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণেরও অনুরোধ করা হয়েছে। একই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও অবহিত করা হয়েছে। এরপরও বিদ্যালয়ের মাঠে মেলা চলমান থাকায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মেলার কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে সংগঠনটি। তাদের অভিযোগ, মাঠজুড়ে মেলার দোকান ও বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করায় শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, শারীরিক শিক্ষা বা পিটি এবং বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রমের জন্য মাঠ ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। সামনে পরীক্ষা থাকায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, পরীক্ষাসংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, স্থানীয় সাধারণ মানুষও দীর্ঘদিন ধরে মাঠটি বিভিন্ন সামাজিক ও শারীরিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে আসছেন। স্থানীয় তরুণ ও যুবকেরা সেখানে খেলাধুলা ও শরীরচর্চা করেন। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরাও নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের জন্য মাঠটি ব্যবহার করেন। মেলার কারণে তাঁদের স্বাভাবিক চলাচল ও মাঠ ব্যবহারের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মানবাধিকার সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, মেলা আয়োজনের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, জেলা প্রশাসন এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংগঠনটির মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ বাস্তবায়নের জায়গা নয়। এটি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, খেলাধুলা ও শারীরিক বিকাশের জন্য সংরক্ষিত থাকা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন বলেন, তিনি মূলত এ মামলার প্রধান পরিচালনাকারী। এর আগেও মানবাধিকার সংগঠনটির জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক মামলা তিনি পরিচালনা করেছেন। তালাশ বিডিকে তিনি বলেন, “একটি বিষয় নিয়ে বারবার কেন মহামান্য হাইকোর্টে আসতে হবে? জেলা প্রশাসকেরা কি হাইকোর্টের আদেশ সম্পর্কে অবগত নন? আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে কোন ক্ষমতাবলে বিদ্যালয়ের মাঠে মেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আগামীকাল আদালতে বিষয়টি তুলে ধরা হবে। মেলার অনুমোদনের আইনগত ভিত্তি কী এবং কোন ক্ষমতাবলে এ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা হবে।”
অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন আরও বলেন, আদালতের আদেশ ও সরকারি নির্দেশনার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জানা থাকার পরও যদি কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এর আইনগত ভিত্তি ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একটি বিষয়ে বারবার আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি না করে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উচিত আইন ও আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা।
আগামীকাল রোববার সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ১১ নম্বর বেঞ্চে এ-সংক্রান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠনটির প্রতিনিধিরা সচিবালয়ে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি অবহিত করার পরিকল্পনা করেছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠের সুরক্ষা, শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পরিবেশ এবং সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
সংগঠনটির বক্তব্য, আদালতের আদেশ ও সরকারি প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের। কোনো কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রচলিত আইন ও আদালতের নির্দেশনার ঊর্ধ্বে হতে পারে না। সরকারি বিধিবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতা আইন দ্বারা নির্ধারিত, আর সেই ক্ষমতার প্রয়োগও আইনের সীমার মধ্যেই থাকতে হবে।
আইন ও আদালতের আদেশের প্রশ্নে কোনো প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা, দায়িত্বহীনতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ নেই। জেলা প্রশাসকসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মকর্তা প্রচলিত আইন ও আদালতের আদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে বাধ্য। প্রশাসনিক ক্ষমতা কোনোভাবেই আদালতের আদেশ অমান্য করা কিংবা সরকারি বিধিবিধানের বাইরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈধতা দেয় না। সরকারি প্রজ্ঞাপন ও আদালতের আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকলে তার আইনগত ভিত্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দায়িত্ব পালনের জন্য, আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করার জন্য নয়। আইনের শাসনে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসকের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে বিষয়টি উল্লেখ করে তাঁর WhatsApp নম্বরে বার্তা পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর কিংবা বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মেলার অনুমোদনের আইনগত ভিত্তি, সরকারি প্রজ্ঞাপন এবং হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে সিংগাইর উপজেলা প্রশাসন এবং জয়মন্টপ উচ্চবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও এ ঘটনায় আলোচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা ও আদালতের আদেশের বিষয়টি অবহিত হওয়ার পরও বিদ্যালয়ের মাঠে মেলা আয়োজন অব্যাহত থাকার ঘটনায় স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা, বিদ্যালয়ের মাঠের যথাযথ ব্যবহার এবং আদালতের আদেশ ও সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রশ্নে আগামীকালের হাইকোর্টের শুনানি এখন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি এবং জবাবদিহির বিষয়টি আদালতে উপস্থাপনের কথা জানিয়েছেন মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন