প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মানুষ সামাজিক জীব, আর এই সমাজে টিকে থাকার জন্য সম্পর্ক গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। তবে বর্তমান যুগে মানুষের সম্পর্কের ধরন এবং মানদণ্ড যেভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তাতে মনে প্রশ্ন জাগে—সম্পর্ক কি হৃদয়ের বাঁধন, নাকি কেবলই লেনদেনের একটি মাধ্যম? বাস্তবতা কখনো কখনো আমাদের এমন কিছু মানুষের প্রকৃত চেহারা চিনিয়ে দেয়, যাদের একসময় নিজের চেয়েও বেশি আপন বলে মনে হতো। যাদের জন্য অনায়াসে নিজের মূল্যবান সময়, হাড়ভাঙা শ্রম, সাধ্য এবং ব্যক্তিগত স্বার্থকে একপাশে সরিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, সময়ের নির্মম ব্যবধানে তারাই বুঝিয়ে দেয়—কিছু সম্পর্কের আড়ালে আসলে কোনো ভালোবাসা বা অনুভূতি থাকে না, থাকে কেবলই সূক্ষ্ম স্বার্থপরতা।
আমি নিজেও একাধিকবার জীবনসংগ্রামের এই তিক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি। কারো কঠিন কিংবা সংকটের দিনে নিঃসংকোচে পাশে দাঁড়িয়েছি, নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। বহুবার নিজের তাগিদ কিংবা প্রয়োজনকে পেছনে ঠেলে অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। তখন সরল মনে বিশ্বাস করতাম—মানুষ অন্তত ভালোবাসার খাতিরে হলেও মানুষের পাশে থাকার বিষয়টি মনে রাখে, সহমর্মিতা ও উপকারের কদর করে।
কিন্তু সময়ের চাকা ঘোরার সাথে সাথে সেই ভুল ধারণা ভেঙে চুরমার হতে সময় নেয়নি।
যতদিন আমার মেধা, বুদ্ধি, শ্রম, সামাজিক পরিচিতি কিংবা সার্বিক সহযোগিতার প্রয়োজন অন্য কারো ছিল, ততদিন আমি তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলাম। প্রয়োজনের সময়ে ঘন ঘন ফোন এসেছে, মিষ্টি মধুর কথায় পাশে থাকার আকুল অনুরোধ জানানো হয়েছে, খুব আপনজন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ যেই মুহূর্তে প্রয়োজন ফুরিয়ে এসেছে কিংবা তাদের স্বার্থসিদ্ধি হয়ে গেছে, অমনি সেই উষ্ণ সম্পর্কের পারদ নিমেষেই হিমাঙ্কে নেমে গেছে।
জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত ও কষ্ট তখনই লাগে, যখন আবিষ্কার করতে হয়—যাদের বিপদে কোনো প্রতিদানের আশা না করে নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলাম, সুযোগ পেলেই আড়ালে তারা আমারই সমালোচনা করছে। সামনে এক রকম মিষ্টতা আর আড়ালে বিষাক্ততা—এই দ্বিমুখী বা দ্বৈত আচরণ মানুষের মনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। তখন নিজের অজান্তেই মনে প্রশ্ন জাগে—এই সম্পর্কটা কি আদৌ কোনো সত্যিকারের বন্ধন ছিল, নাকি পুরোটাই ছিল প্রয়োজনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক নাটক?
স্বার্থপর মানুষের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো, তারা আপনার অতীত ত্যাগ, ঘাম কিংবা রক্ত জল করা উপকারের কথা কখনোই স্মরণে রাখে না। তারা কেবল বর্তমানের হিসেবনিকেশ কষে—আজ আপনি তার জন্য কতটা দরকারী বা লাভজনক। আপনি যতদিন তাদের কিছু দিতে পারবেন, ততদিন আপনার কদর থাকবে, খাতির থাকবে। আর যখনই আপনার দেওয়ার ক্ষমতা বা সুযোগ কমে আসবে, ঠিক তখনই আপনার অজস্র ভালো কাজগুলো স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে।
এই কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়ে আমি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি—আমি আর কারো কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বা মূল্য প্রমাণ করার লড়াইয়ে নামব না। কাউকে অতীতে করা উপকারের বিনিময়ে কৃত্রিম ভালোবাসা, সহানুভূতির জোড়াতালি কিংবা কোনো কৃতজ্ঞতাও আশা করি না। আমি শুধু এটুকু চাই—সম্পর্ক যদি টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে তা যেন প্রয়োজনের তাগিদে নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবে অন্য মানুষকে শ্রদ্ধা ও সম্মান দেওয়ার জায়গা থেকে গড়ে ওঠে।
কারণ, যে কোনো সম্পর্কের আসল অগ্নিপরীক্ষা প্রয়োজনের সময়ে নয়, বরং প্রয়োজন শেষ হওয়ার পর শুরু হয়। যে মানুষটি আপনার কাছ থেকে কোনো বৈষয়িক বা ব্যক্তিগত সুবিধা না পেয়েও আপনার পাশে থাকে—তার মূল্য সত্যিই আলাদা। তাকেই আগলে রাখা উচিত। আর যারা প্রয়োজন মেটার সাথে সাথে আপনাকে দূরে ঠেলে দেয়, তাদের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের মূল্যবান সময় ও মানসিক শান্তি নষ্ট করার কোনো অর্থ হয় না।
মনে রাখা দরকার, যেকোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার একক দায়িত্ব কখনোই একজনের হতে পারে না। যে জায়গায় আপনার আত্মসম্মানবোধ ক্ষুণ্ন হয়, যেখানে আপনাকে একজন 'মানুষ' হিসেবে না দেখে কেবল একটি 'প্রয়োজনীয় বস্তু' হিসেবে বিবেচনা করা হয়—সেখান থেকে নিঃশব্দে সরে আসাই পরম বুদ্ধিমত্তা ও আত্মসম্মানের পরিচয়। কারো প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে যদি আপনার গুরুত্বও ফুরিয়ে যায়, তবে জেনে রাখুন—আপনি কিছুই হারাননি; বরং খসে পড়েছে একটি সম্পর্কের মিথ্যে মুখোশ। আর মাঝে মাঝে এই মুখোশ খুলে যাওয়াটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে কষ্টের, কিন্তু সবচেয়ে সত্য ও শিক্ষণীয় অধ্যায়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন