প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভাণ্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্পের পাইপলাইনে লিকেজ শনাক্ত করতে তিন মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেছে, যার ব্যয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। চট্টগ্রাম ওয়াসা এখনো মেরামত করে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে পারেনি।
বাংলা নিউজের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ও মইজ্জারটেক এলাকার প্রায় ২৫০টি সংযোগে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এই সংযোগগুলোর বিপরীতে আনুমানিক দুই থেকে আড়াই হাজার মানুষ পানিসংকটে রয়েছেন। ওয়াসার কর্মকর্তারা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না, কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।
এদিকে, একটি এলাকায় দিনের পর দিন পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকেরা বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে যেসব পরিবার ওয়াসার পানি পাওয়ার পর বিকল্প পানির উৎস বন্ধ করে দিয়েছিল, তাদের দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েক গুণ। পানি না থাকায় রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও সংকটে পড়েছে। তিন মাস ধরে চলা এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ।
জানা গেছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার আবাসিক গ্রাহক এবং শিল্প-কারখানায় পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ভাণ্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্প হাতে নেয় চট্টগ্রাম ওয়াসা। ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা পরে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৯৯৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৯৫৮ কোটি টাকা বা ৯২ শতাংশের বেশি।
পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটির কাজ ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় দুটিই বাড়ানো হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৩৩ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। পানি শোধনাগারটির দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ছয় কোটি লিটার।
প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পটিয়ার শিকলবাহা খালের তলদেশে কালারপোল সেতুর পাশে বিশেষ টানেল তৈরি করে পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। ২০২২ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া এ কাজ ২০২৩ সালের শেষ দিকে সম্পন্ন হয়। পরে ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে পুরো পাইপলাইনের জোড়াতালি পরীক্ষা ও পরীক্ষামূলক পানি সরবরাহ কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পাইপলাইন স্থাপনের দুই বছর পার না হতেই সংশ্লিষ্ট লাইনে লিকেজ দেখা দেওয়ায় প্রকল্পের নির্মাণমান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
লিকেজ শনাক্তে ওয়াসার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মাহবুব আলম বলেন, "আমাদের প্রকল্পের কাজ চলছে। কোরিয়ান কম্পানি লিকেজ শনাক্তে কাজ করছে। নদীর নিচ দিয়ে প্রায় ৮০ ফুট টানেলের মাধ্যমে পাইপলাইন নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রায় ৮০ ফুট গভীরতায় কাজ করতে হচ্ছে। এ কারণে লিকেজ খুঁজে পেতে সময় লাগছে।"
কবে নাগাদ লিকেজ শনাক্ত ও মেরামত করে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা যাবে, তা নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেননি তিনি।
এদিকে দীর্ঘদিন পানি না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শিকলবাহা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, "তিন মাস ধরে এলাকায় পানি নেই। বিকল্প পদ্ধতিতে আমাদের চলতে হচ্ছে। এ এলাকায় আগে গভীর নলকূপসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা ছিল। ওয়াসার পানি আসার পর অনেকে সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন। তিন মাস ধরে যে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে, তা অবর্ণনীয়। পানি ছাড়া এক মুহূর্তও চলা সম্ভব নয়। সেখানে মাসের পর মাস পানি ছাড়া মানুষ কিভাবে আছে, সেটি ওয়াসার কর্মকর্তাদের বোঝা উচিত।"
শহরতলি হওয়ায় কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ও মজ্জারটেক এলাকায় দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে। একদিকে গড়ে উঠেছে ভারী শিল্পকারখানা, অন্যদিকে আবাসিক ভবন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বাড়ছে। তুলনামূলক কম খরচে বসবাসের সুযোগ থাকায় এ এলাকায় জনবসতিও বাড়ছে। ফলে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও পড়েছে বিপাকে।
মইজ্জারটেক এলাকায় রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত জামিল আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, "আমরা কিভাবে ব্যবসা করছি, তা বোঝাতে পারব না। ওয়াসার পানি তিন মাস ধরে বন্ধ। ওয়াসায় যোগাযোগ করেছিলাম। তারা বলছে, সঞ্চালন লাইনে লিকেজ আছে। একটি লিকেজ সারাতে এত দিন লাগে কিভাবে? আমার ধারণা, এ প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে।"
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানে আলম বাংলানিউজকে বলেন, "আমি পরিদর্শন করেছি। কিভাবে, কোথায় লিক হয়েছে, তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। ওয়াসার লোকজন এখনো কাজ করছে।"
কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংকের ঋণ, সরকারি অর্থ এবং চট্টগ্রাম ওয়াসার নিজস্ব তহবিলে বাস্তবায়িত হয় প্রকল্পটি। এর মধ্যে কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় এক হাজার ২২৪ কোটি টাকা, সরকার থেকে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা এবং ওয়াসার নিজস্ব তহবিল থেকে ২০ কোটি টাকা দেওয়া হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন