প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
‘অহন আমি কিবায় চলবাম? এই অবুজ সন্তানরে কিবায় পালবাম? আমি আমার স্বামীর লাশটা ফেরত চাই। আর যারা আমার স্বামীরে ধোঁকা দিয়া এ যুদ্ধের মুখে পাডাইছে, আমি ওই অপরাধী দালালরার বিচার চাই!’—এভাবেই বিলাপ করছেন ভাগ্যহত মহিমা আক্তার, যিনি তাঁর সাড়ে তিন বছর ও মাত্র ৫ মাস বয়সী দুই দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে বুকে জড়িয়ে রেখেছেন। উচ্চ বেতনে ‘ইলেকট্রনিক শ্রমিক’ হিসেবে কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে গত প্রায় ৫ মাস আগে সুদূর রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তাঁর স্বামী আল মামুন (২৫)। কিন্তু দালালের নির্মম প্রতারণার শিকার হয়ে শ্রমিকের বদলে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল মারণাস্ত্র। তাঁকে বাধ্য করা হয়েছিল ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসমরে অংশ নিতে। অবশেষে ইউক্রেনীয় বাহিনীর এক বিধ্বংসী ড্রোন হামলায় প্রাণ হারাতে হলো ময়মনসিংহের নান্দাইলের এই যুবককে। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে এখন পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েছে তাঁর পরিবার।
আল মামুন ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে গত ৭ মে ‘জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন মামুন। ইলেকট্রনিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য এজেন্সির সঙ্গে তাঁর ৯ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। এ বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করতে পরিবারটি ব্যাংক থেকে ঋণ এবং চড়া সুদে ধারদেনা করতে বাধ্য হয়েছিল।
পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর মাত্র চার দিন পর ওই প্রতারক এজেন্সি এবং একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্র মামুনসহ তাঁদের ৩০ জনের দলটিকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। সেখানে তাদের কোনো কাজের সুযোগ না দিয়ে, জোরপূর্বক সামরিক পোশাক পরিয়ে ও হাতে অস্ত্র দিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের একেবারে প্রথম সারিতে (ফ্রন্টলাইন) পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে মামুনের সঙ্গে থাকা ঝিনাইদহের সহকর্মী রাজন মিয়ার একটি ফোনকলে মামুনের মৃত্যুর খবর পরিবার জানতে পারে। রাজন মিয়া জানান, প্রায় ১৫ দিন আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর একটি আকস্মিক ড্রোন হামলায় মামুন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ওই একই হামলায় রাজন নিজেও গুরুতর আহত হন। পরে রাশিয়ার একটি হাসপাতাল থেকে কোনোমতে পালিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
মামুনের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। বাগরুদ্ধ বৃদ্ধা মা রোকেয়া বেগম আর দুই অবুঝ শিশুকে নিয়ে স্ত্রী মহিমার কান্না থামছেই না। যে স্বপ্ন নিয়ে মামুন বিদেশ গিয়েছিলেন, তা এখন এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। মহিমা চড়া সুদের ঋণের বোঝা এবং দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন। এলাকাবাসীদের কথায়, অন্তত মামুনের মরদেহটি শেষবারের মতো দেশে ফিরিয়ে এনে নিজ মাটিতে দাফন করার ব্যবস্থা করা উচিত এবং এই জঘন্য পাচারকারী চক্রকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নান্দাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজহারূর ইসলাম জানান, বিষয়টি কেউ থানায় জানাননি। পরিবার যদি অভিযোগ দেয়, তাহলে তদন্ত করে অভিযুক্ত দালালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন