প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চট্টগ্রাম, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ : ‘যদি স্কুলটি না থাকে, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে প্রতিবন্ধী শিশুদের। তারা সমাজের মূলধারায় আসতে পারবে না। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে তাদের মধ্যে কেউ কেউ রাস্তায় গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করতে বাধ্য হবে, পারিবারিকভাবে হেনস্তার শিকার হবে এবং সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হবে।’ এই ব্যথিত মন্তব্যগুলো করেছেন চট্টগ্রামের ফিজিক্যালি হ্যান্ডিক্যাপড ট্রেনিং (পি.এইচ.টি.) সেন্টারের অধীনে পরিচালিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষক মোহাম্মদ মুখলেসুর রহমান মুকুল।
নিজের দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে তিনি এখন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষাগুরু হিসেবে কাজ করছেন।
চট্টগ্রামের মুরাদপুরে অবস্থিত পি.এইচ.টি সেন্টার সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
এই সেন্টারের অধীনে পরিচালিত বাক্-শ্রবণ প্রতিবন্ধী ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় দু’টি চট্টগ্রামের প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল।
এখানে শিক্ষার্থীদের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্বল্প খরচে পড়াশোনার পাশাপাশি বিশেষ চাহিদার ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এর ফলে বাক্-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুরা শিক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগ পাচ্ছে।
বর্তমানে বিদ্যালয় দু’টিতে মোট ১২০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ৭০ জন আবাসিক এবং ৫০ জন অনাবাসিক। প্রতিদিনের রুটিনে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বিশেষ চাহিদার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ইশারা ভাষা, ঠোঁট দেখে কথা বোঝার অনুশীলন এবং ব্রেইল পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দুই শিফটে ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে।
এছাড়া, সেন্টারটিতে ৪৪টি পদের মধ্যে ৩৬টি পদ শূন্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও নেই।
এ বিষয়ে শিক্ষক মোহাম্মদ মুখলেসুর রহমান মুকুল বলেন, এটি একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। এক সময় এখানে কাঠ, চর্ম, সেলাই এবং বাঁশ-বেতের আসবাবপত্র তৈরির জন্য বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এসব প্রশিক্ষণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানে সহায়ক ছিল। কিন্তু কারিগরি বিভাগে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় বর্তমানে তা বন্ধ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, বাক্-শ্রবণ বিদ্যালয়ের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত একমাত্র শিক্ষক মোহাম্মদ মহসিন সরকার নিজেও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি মূলত সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং আবাসিক সুবিধা— এই তিনটি অঙ্গ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল।
তিনি বলেন, ‘আমাদের একাডেমিক ভবন নেই, তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জনবল সংকট। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে তিনজন শিক্ষক থাকলেও বাক্-শ্রবণ বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন কেবল একজন। এসব প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন।’
এক সময় এখানে বাক্-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা দুটি বিদ্যালয়, চারটি প্রশিক্ষণ সেন্টার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবন এবং বালক-বালিকাদের জন্য আলাদা হোস্টেল ভবন ছিল। কিন্তু, ২০১৬ সালে সমাজসেবা কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য প্রতিষ্ঠানের পুরনো ভবনগুলো ভেঙে ফেলা হয়। ফলে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের চতুর্থ তলায় অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে বিদ্যালয় দু’টির কার্যক্রম চলতে থাকে।
শিক্ষক দুজন মনে করেন, সংকট কাটাতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সেক্টরভিত্তিক জনবল নিয়োগ, কারিগরি ও ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ, দৃষ্টি ও বাক্-শ্রবণ বিদ্যালয়ের জন্য পৃথক একাডেমিক ভবন, ছেলে-মেয়েদের জন্য আলাদা আবাসিক ভবন এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য ওয়ার্কশপ নির্মাণ জরুরি।
এছাড়া, পুরো প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন।
এদিকে, নিজের সন্তানকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হাটহাজারী থেকে মুরাদপুরে আসেন অভিভাবক ওমর উদ্দিন মাহমুদ। তার দুই ছেলে বাক্-শ্রবণ প্রতিবন্ধী। বড় ছেলে এই বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে ঢাকার বাক্-শ্রবণ প্রতিবন্ধী উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট ছেলে পড়ছে এই বিদ্যালয়েরই পঞ্চম শ্রেণিতে।
মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের এখানে পড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আমার দুই ছেলেই বাক্-শ্রবণ প্রতিবন্ধী। বিদ্যালয়টি না থাকলে তাদেরকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না।’
তবে পঞ্চম শ্রেণির পর চট্টগ্রামে বাক্-শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য আর কোনো বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় অভিভাবকদের নতুন সংকটে পড়তে হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের ঢাকায় যেতে হয়, যা অনেক পরিবারের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী অভিভাবক বলেন, চট্টগ্রামের প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য আর কোনো বিশেষায়িত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান নেই। এই স্কুল দু’টি যদি এসএসসি পর্যন্ত করা যেতো, তাহলে অনেক উপকার হতো।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এসব বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুধুমাত্র শিক্ষা নয়, প্রতিবন্ধী শিশুদের আত্মনির্ভরশীল করে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হয়।
তাছাড়া ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী প্রতিবন্ধীদের সমন্বিত শিক্ষার অধিকার রয়েছে। সুতরাং, জনবল নিয়োগ, কারিগরি প্রশিক্ষণ চালু, শিক্ষার পরিধি পঞ্চম শ্রেণির পরেও সম্প্রসারণ এবং স্থায়ী ও সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি।
‘সংশপ্তক’ এনজিওর প্রধান নির্বাহী লিটন চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেলায় কয়েক হাজার দৃষ্টি ও বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশু থাকলেও শিক্ষার আলো পায় মাত্র দুই-তিনশো, তাও প্রাইমারি পর্যন্ত। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য চট্টগ্রামে একটি উচ্চবিদ্যালয়, সম্ভব হলে একটি কলেজও খুব বেশি জরুরি। নয়তো তাদের সমাজের মূলধারায় আনা কখনো সম্ভব হবে না।’
তিনি আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধীদেরকে পাঠদান দিতে প্রতিটি প্রাইমারি স্কুলে অন্তত একজন করে শিক্ষককে ইশারা ভাষায় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের কর্মক্ষম করে তুলতে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, আমরা চাই প্রতিবন্ধী শিশুরা শিক্ষার্জন করে সমাজের মূলধারায় ফিরে আসুক। সে লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। তবে, আমরা চাইলেই শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারি না। ২০১৯ সালের পর থেকে সম্ভবত নতুন করে আর সার্কুলার হয়নি। আশা করি দ্রুতই শিক্ষক নিয়োগ হবে।
অবকাঠামোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্কুল দু’টি নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। দুটি একাডেমিক ও দুটি আবাসিক ভবনের একটি ডিপিপি সম্ভবত প্লানিং কমিশনে আছে। আরও কিছু সংস্কার কাজও হবে।’
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন