প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
প্রায় ২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন পুনরুদ্ধারের পর এবার বাণিজ্যিক উৎপাদনের ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফুটি কার্পাস তুলা শনাক্তকরণ, হাতে সুতা কাটা ও ঐতিহ্যবাহী তাঁতে কাপড় বোনার প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের শেষ নাগাদ এটি বেসরকারি খাতে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
মসলিন দেখে দেশি-বিদেশি ক্রেতা ও উদ্যোক্তারা আগ্রহ দেখিয়েছেন। চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকাই মসলিন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের পরিচালক মো. আইয়ুব আলী বাংলানিউজকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, মসলিনের বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য ইতিমধ্যে দেশে ১৫ জন উদ্যোক্তা সরকারের কাছে আবেদন করেছেন এবং উপযুক্ত উদ্যোক্তাদের অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রযুক্তি হস্তান্তরের যাবতীয় নিয়ম ও পদ্ধতিও নথিভুক্ত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা
একসময় বাংলার রাজদরবার ও অভিজাতদের পরিধেয় ঢাকাই মসলিন ইউরোপসহ সারা বিশ্বে রপ্তানি হতো। সূক্ষ্ম বুনন ও মিহি সুতার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক কদর ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর পুনরুদ্ধার করা এই মসলিন দেখতে এসে আবার দেশি-বিদেশি ক্রেতা ও উদ্যোক্তারা আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
প্রকল্প পরিচালক বাংলানিউজকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের উদ্যোক্তা ও ক্রেতারা মসলিনে তীব্র আগ্রহ দেখিয়েছেন। ফ্রান্সে মুঘল ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেন এমন প্রতিনিধিরা আলোচনা করেছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০০ গজ মসলিন ক্রয়ের সরাসরি অনুরোধ এসেছে।’
বর্তমানে প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় মিলিয়ে তৈরি হওয়া সংরক্ষিত শাড়ি, স্কার্ফ ও রুমালে শৌখিন ক্রেতারা আগ্রহ দেখালেও এখনই তা বিক্রি করা হচ্ছে না। বেসরকারি খাতে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থা গড়ে উঠলেই সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এই কাপড় বাজারে ছাড়া হবে।
কিভাবে ফিরল ঢাকাই মসলিন?
তাৎপর্যপূর্ণ এই শিল্প পুনরুদ্ধারে ২০১৩ সালে সরকারি উদ্যোগে গবেষণা শুরু হয়। ঐতিহাসিক নথি, গবেষণাপত্র ও জাদুঘরে সংরক্ষিত নমুনা পর্যালোচনা করে সফলতার মুখ দেখেন গবেষকরা।
প্রকল্পের মুখ্য গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মঞ্জুর হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, গবেষণায় জেমস টেলরের ‘এ স্কেচ অব দ্য টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস অব ঢাকা’, অধ্যাপক আবদুল করিমের ‘ঢাকাই মসলিন’ এবং সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াসের ‘স্পিসিস প্ল্যান্টারাম’ বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক নমুনার সহায়তা নেওয়া হয়।
গবেষণায় দেশজুড়ে সংগৃহীত ৩৯টি তুলার নমুনার মধ্যে ছয়টি জাত শনাক্ত করা হয়। পরে ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, গাজীপুরের কাপাসিয়া অঞ্চলের তুলার সঙ্গে ঐতিহাসিক মসলিনের ‘ফুটি কার্পাস’ তুলার ডিএনএ-র প্রায় ৯৬ শতাংশ মিল রয়েছে।
বিশেষত্ব ও কারিগর তৈরি
ঢাকাই মসলিনের মূল বিশেষত্ব হলো নির্দিষ্ট জাতের তুলা (ফুটি কার্পাস), হাতে কাটা সূক্ষ্ম সুতা, দক্ষ কারিগর ও বিশেষ তাঁতের অনন্য সমন্বয়। আর্দ্র পরিবেশ বজায় রাখতে সোনারগাঁ, কাপাসিয়া এবং শীতলক্ষ্যা-মেঘনা নদীর অববাহিকায় সকাল বা সন্ধ্যায় বিশেষ প্রক্রিয়ায় এর সুতা কাটা হতো।
ফুটি কার্পাস নিশ্চিত হওয়ার পর গাজীপুরে তুলা বোর্ড এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিতে তুলা চাষ শুরু হয়। সুতা কাটা ও বুননের জন্য কুমিল্লার চান্দিনার খাদি কারিগরদের মধ্য থেকে বাছাইকৃতদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষিত এসব কারিগরের পাশাপাশি বর্তমানে মসলিন হাউসের আরো ১৩০ জন তাঁতি ও কারিগর চূড়ান্ত উৎপাদনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত
বাণিজ্যিকভাবে মসলিন উৎপাদন শুরু হলে গ্রামীণ পর্যায়ে তুলাচাষি, সুতা প্রস্তুতকারক ও তাঁতিদের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অধ্যাপক ড. মঞ্জুর হোসেনের মতে, বড় পরিসরে উৎপাদনের জন্য ফুটি কার্পাস তুলার জোগান বাড়ানো প্রয়োজন। তাই চাষিদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক তুলা উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী ও সময়সাপেক্ষ এই কাপড়ের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও দেশি-বিদেশি বাজার এবং শৌখিন সংগ্রাহকদের মধ্যে এর বিশাল চাহিদা তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যাপ্ত তুলা, দক্ষ কারিগর ও বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয়ে চলতি বছরের শেষ নাগাদ শুরু হওয়া এই বাণিজ্যিক যাত্রা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নতুন ইতিহাস যোগ করবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন