প্রিন্ট এর তারিখঃ ৮ই নভেম্বর, ২০২৬ইং; ০৬:৩১ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ ৮ই নভেম্বর, ২০২৬ইং; ০৫:২৭ পি.এম
ইরানে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য যে যুদ্ধ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং ইসরায়েলে ক্ষমতার নতুন সমীকরণে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু একপ্রকার ক্ষমতা হারানোর পথে সময়ের প্রহর গুনছেন অন্যদিকে যে উদ্দেশ্যে ইরানের উপর আক্রমণ করা হয়েছিল কোন লক্ষ্যই তারা বাস্তবায়ন করতে পারেনি বরং ইরান সরকার আরও ব্যাপকভাবে ইরানে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক ড্রোন ব্যবস্থায় তিনগুণ উৎপাদন বাড়িয়েছে সম্ভাব্য নতুন আক্রমণের আশঙ্কায় যে ইরান পরমাণু অস্ত্র বানায়নি সেই ইরান হয়তো পরমাণু অস্ত্র বানিয়ে ফেলছে। অর্থাৎ যে ইরান আগে নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত একটি দুর্বল রাষ্ট্র হিসেবে মনে হতো সেই ইরান এই যুদ্ধের পর বিশ্বের আরেক পরাশক্তি হয়ে উঠেছে। তাহলে ইরান যুদ্ধ কি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের উদ্যোক্তাদের জন্যই বুমেরাং হয়ে উঠছে?
ইরানের সরকার পরিবর্তন, দেশটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে কয়েক দশক ধরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও সামরিক হুমকিসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা। বিশেষ করে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাবকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। কিন্তু এত আয়োজন, এত নিষেধাজ্ঞা এবং এত সামরিক অভিযানের পরও ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়া কিংবা দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধ ছিল এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় অংশ নেয়। এরপর ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। এবারের অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে সংঘাতটি গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু যে রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে এই সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, তার কতটুকু অর্জিত হয়েছে? ইরানের শাসনব্যবস্থা কি পরিবর্তিত হয়েছে? দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো কি ভেঙে পড়েছে? কিংবা ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের সক্ষমতা কি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সামরিক শক্তি দিয়ে একটি দেশের অবকাঠামো ধ্বংস করা আর সেই দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেদের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করা এক বিষয় নয়।
ইরানের সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য কি ব্যর্থতার মুখে?
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল দেশটির নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর এমন আঘাত হানা, যাতে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা ভেঙে যায়। সর্বোচ্চ নেতা থেকে শুরু করে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করার মধ্য দিয়ে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করলেই সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে যায় না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, সামরিক সংগঠন, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক উত্তরাধিকারব্যবস্থা কার্যকর থাকলে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হলেও রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে। ইরানের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা সামনে এসেছে।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত হিসাবের সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান। একটি দেশকে সামরিকভাবে দুর্বল করা সম্ভব হলেও তার জনগণ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা বহিঃশক্তির জন্য অত্যন্ত জটিল। ইরানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সংঘাত সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে।
ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের ক্ষমতার ভিত কি দুর্বল হয়ে পড়ছে?
ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক অভিঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্য ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যাপক হলেও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের ব্যয়, সামরিক সহায়তা, প্রতিরক্ষা বাজেট এবং পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে প্রশাসনের বিরোধ বাড়তে পারে।
ইরান অভিযানের আর্থিক মূল্যও কম নয়। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযানে ব্যয় দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। বিপুল সামরিক ব্যয়, প্রাণহানি এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে এখন মার্কিন প্রশাসনকে আরও বেশি জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
তবে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো মানেই প্রেসিডেন্টের পদ হারানো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসনের অভিযোগ অনুমোদন এবং সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরই প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে অপসারণ করা সম্ভব। তারপরও মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের অবশিষ্ট মেয়াদ পরিচালনায় বড় রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের নজরদারি ও রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।
যে প্রেসিডেন্ট ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছেন, তাঁকেই এখন নিজের দেশের আইনসভায় বিরোধী সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ইতিহাসের রাজনৈতিক পরিহাস এখানেই।
নেতানিয়াহুর জন্যও কি বন্ধ হয়ে আসছে ক্ষমতার দরজা?
ইসরায়েলের রাজনীতিতেও একই সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন পেলেও তাঁর সমর্থক জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে বিরোধী নেতা ও সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শিবির নতুন সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো ১৯টি আসন পাওয়ায় সরকার গঠনের হিসাব আরও জটিল হয়েছে। ৭ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ গাদি আইজেনকোটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁকে সরকার গঠনের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে।
এখনো নেতানিয়াহুর সরকারের আনুষ্ঠানিক পতন ঘটেনি। তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান যে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারকারী নেতানিয়াহুকে এখন নিজের দেশের রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে।
তাঁর বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলাগুলোও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার কারণে বিচারপ্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক চাপ নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সরকার পরিবর্তিত হলে তা নতুন মাত্রা পেতে পারে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আইনি ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।
সামরিক বিজয় আর রাজনৈতিক বিজয় এক নয়
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে সামরিক শক্তিধর রাষ্ট্র যুদ্ধের ময়দানে বিপুল শক্তি প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ তার অন্যতম উদাহরণ। বিপুল অর্থ, অস্ত্র ও সামরিক শক্তি ব্যয় করেও যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফল অর্জন করতে পারেনি। আফগানিস্তানে দুই দশকের সামরিক উপস্থিতির পর ২০২১ সালে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারও দেখিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান কোনো দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের নিশ্চয়তা দেয় না।
ইরানের ক্ষেত্রেও এই ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রাসঙ্গিক। দেশটির রয়েছে বিশাল ভৌগোলিক আয়তন, উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা, দীর্ঘ রাষ্ট্রীয় ইতিহাস, সামরিক শিল্পভিত্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা, হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীর উপস্থিতি সংঘাতকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে।
ইরানকে সামরিকভাবে আঘাত করা সম্ভব, কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া শুধু ইরানের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। পারস্য উপসাগর, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি হলে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
অতএব যুদ্ধের সাফল্য বিচার করতে হলে শুধু কতটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলো কিংবা কতটি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হলো, তা দেখলে চলবে না। যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য, রাজনৈতিক পরিণতি এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ইউরোপ কি এবার নিজের স্বার্থের হিসাব করবে?
ইরান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইউরোপের অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো মিত্র হলেও ইউরোপের প্রতিটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তাগত স্বার্থ এবং মধ্যপ্রাচ্যনীতি এক নয়। ইউরোপের জন্য ইরান যুদ্ধের অর্থ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শরণার্থী সংকট এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা।
ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইউরোপের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে ইউরোপীয় শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নতুন শরণার্থী প্রবাহ এবং মানবিক সংকটও ইউরোপের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তাই ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সামনে প্রশ্ন—তারা কি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান পুরোপুরি একীভূত করবে, নাকি নিজস্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থ বিবেচনা করে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে সক্রিয় হবে?
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা কি উড়িয়ে দেওয়া যায়?
ইরানকে ঘিরে সংঘাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর সম্ভাব্য বিস্তার। যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মৌলিক বিরোধগুলো অমীমাংসিত রয়েছে।
প্রতিটি নতুন হামলা প্রতিশোধের নতুন কারণ তৈরি করে। একটি হামলার জবাবে পাল্টা হামলা, তার প্রতিক্রিয়ায় আরও বড় সামরিক অভিযান—এভাবে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে রাশিয়া, চীন এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর স্বার্থও এতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে প্রতিটি আঞ্চলিক সংঘাতকে সরাসরি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কিন্তু বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ সামরিক সম্পৃক্ততা এবং পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করতে পারে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আরবিতে যাকে মালহামা বলা হয়, সেই মহাযুদ্ধের আশঙ্কা নিয়েও ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিসরে আলোচনা রয়েছে। বাস্তবতার বিচারে তাই যুদ্ধের বিস্তার রোধ করাই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ রয়েছে
ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য দূরবর্তী কোনো ভূরাজনৈতিক ঘটনা নয়। মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। আন্তর্জাতিক পরিবহন ও বিমা খরচ বাড়লে দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অতএব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থেই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা জরুরি। আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং কূটনৈতিক সমাধানের নীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
শেষ কথা: যুদ্ধ শুরু করা সহজ, পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ইরান যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক আঘাত, সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মৃত্যু এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পরও দেশটির রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের দল কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এবং ইসরায়েলে নেতানিয়াহু নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি হয়েছেন।
এ ঘটনাগুলোকে ইরানের চূড়ান্ত সামরিক বিজয় কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পূর্ণ পরাজয় হিসেবে সরলীকরণ করা যাবে না। কিন্তু সামরিক শক্তি প্রয়োগের রাজনৈতিক মূল্য যে রয়েছে, তা স্পষ্ট। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরাও সেই মূল্য থেকে মুক্ত নন।
ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর সামনে তাই এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। তারা কি বৃহৎ শক্তির সামরিক কৌশলের অনুসারী হয়ে সংঘাতের বিস্তারে ভূমিকা রাখবে, নাকি নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় কূটনৈতিক সমাধানের পথকে শক্তিশালী করবে?
একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সিদ্ধান্ত নিতে কয়েক মুহূর্তই যথেষ্ট। কিন্তু সেই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিক্রিয়ায় যে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে, তা নেভাতে কয়েক দশকও যথেষ্ট নাও হতে পারে।
ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—কোনো রাষ্ট্রকে সামরিকভাবে আঘাত করা আর তার ভবিষ্যৎ নিজেদের ইচ্ছামতো লিখে দেওয়া এক বিষয় নয়। যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা অনেকের থাকতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সব সময় যুদ্ধ শুরু করা পক্ষের হাতে থাকে না।
আর সেই পরিণতির সবচেয়ে নির্মম মূল্য দিতে হয় ক্ষমতার টেবিলে বসে থাকা নেতাদের নয়, বরং যুদ্ধের সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা না রাখা সাধারণ মানুষকে।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন