প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় যখন গোটা বিশ্ব বুঁদ হয়ে আছে, তখন ক্রিকেটের লাইমলাইটের প্রায় পুরোটাই ছিনিয়ে নিয়েছিলেন—এক ভারতীয় কিশোর এবং সেটি মাঠে না খেলেই। গত আইপিএলে অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পর নির্বাচকরা বাধ্য হয়েছিলেন ১৫ বছর বয়সী বিস্ময়বালক বৈভব সূর্যবংশীকে দলে ডাকতে।
কিন্তু আয়ারল্যান্ড সফরের দুই টি-২০ কিংবা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের প্রথম ম্যাচ—কোথাওই তার একাদশে জায়গা মেলেনি।
বৈভবের মতো বিস্ফোরক ব্যাটারকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার বিষয়টি নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে যায়। ভারত তো বটেই, বিভিন্ন দেশের কিংবদন্তিদের মনে এক প্রশ্ন ছিল—বৈভব সূর্যবংশী কবে মাঠে নামবেন? যারা গত আইপিএল দেখেননি, তাদের কাছে এই প্রশ্ন বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে; কিন্তু যারা দেখেছেন, তারা অবাক—কেন তাকে মাঠে নামানো হচ্ছে না?
অবশেষে শনিবার ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে সব প্রশ্নের অবসান ঘটলো। সিরিজের দ্বিতীয় টি-২০ ম্যাচে ভারতের সর্বকনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে ১৫ বছর ৯৯ দিন বয়সে বৈভবের অভিষেক হলো।
এই অভিষেকের মাধ্যমে তিনি সিংহাসনচ্যুত করলেন ভারতের ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’ শচীন রমেশ টেন্ডুলকারকে। ১৯৮৯ সালে শচীন যখন প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমেছিলেন, তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর ২০৫ দিন। ওল্ড ট্রাফোর্ডে ভারতের সহ-অধিনায়ক তিলক ভার্মা বৈভবের হাতে তুলে দেন ঐতিহাসিক ক্যাপটি।
সিদ্ধান্তটা যে ভারতের টিম ব্যবস্থাপনা কিংবা ম্যানেজমেন্টের জন্য কতটা কঠিন ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বৈভবকে খেলাতে গেলে বাদ পড়বেন কে? ভারতের তিন টপ অর্ডার ব্যাটারই আছেন ফর্মের তুঙ্গে। ওপেনার অভিষেক শর্মা টি-২০ র্যাঙ্কিংয়ের ২ নম্বরে, তিনে খেলা ঈশান কিশান আছেন ১ নম্বরে। আর অপর ওপেনার সঞ্জু স্যামসন মাত্র তিন মাস আগে ৫ ইনিংসে ৮০.২৫ গড় এবং ১৯৯.৩৭ স্ট্রাইক রেটে ৩২১ রান করে ভারতকে টি-২০ বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন।
এমন তিনজনকে বাদ দেওয়া যেমন কঠিন, তেমনি সূর্যবংশীকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা অসম্ভব ছিল। শেষ পর্যন্ত হেড কোচ গৌতম গম্ভীর এবং অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হলো।
বেচারা স্যামসনের কপাল পুড়ল। সর্বশেষ তিন ইনিংসে ৫, ০ ও ১ রান করার খেসারত দিয়ে বৈভবের জন্য তাকে জায়গা ছেড়ে দিতে হলো।
গত কয়েকদিন ধরে বৈভবকে খেলানো না নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে ছিল ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট। যদিও তারা হুট করে পরীক্ষিত পারফরমারদের বাদ দিতে চাননি। ভারতের সহকারী কোচ রায়ান টেন ডেসকাটে যে বলেছিলেন, ‘অন্য সবার মতো বৈভবকেও প্রক্রিয়ার মধ্যে আসতে হবে’, তিনি রীতিমতো খলনায়ক বনে গিয়েছিলেন।
টানা তিন ম্যাচ ধরে এই প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে ক্লান্ত অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ারকে গতকাল টসের পর বৈভবের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কথা বলতে হলো। শ্রেয়াস বলেন, ‘গত কয়েক মাসে আপনারা তাকে ব্যাট করতে দেখেছেন। আমার মনে হয় দলে থাকার যোগ্যতা তার পুরোপুরি আছে। তিনি এমন একজন যে একেবারেই চাপ নেয় না; তিনি একরোখা ও অবিচল স্বভাবের। আগামী ম্যাচগুলোতে কী হতে চলেছে সে সম্পর্কে তিনি খুব ভালো করেই জানেন। নেটে যেভাবে ব্যাটিং করেন এবং বোলারদের মোকাবেলা করেন, তা থেকেই বোঝা যায় তিনি কেমন মানের খেলোয়াড়। ভারত যে পরিমাণ প্রতিভা তৈরি করছে, তা সত্যিই চোখ জুড়ানো। এটা আমাদের সবসময় সতর্ক ও প্রস্তুত রাখে। আমার মনে হয় চাপ পাওয়াটা একটা সৌভাগ্যের বিষয়।’
১৫ বছর বয়সী কিশোরকে নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বের এত মাতামাতি কেন? আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার আগেই সূর্যবংশী একের পর এক রেকর্ড ভেঙে চুরমার করেছেন। সবশেষ আইপিএলে ২৩৭.৩০ স্ট্রাইক রেটে ৭২টি ছক্কায় তিনি ৭৭৬ রান করেছেন। বিশ্বের বাঘা বাঘা বোলারদের অবলীলায় গ্যালারিতে পাঠিয়ে টুর্নামেন্টের মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার, অরেঞ্জ ক্যাপ, ইমার্জিং প্লেয়ার, সুপার স্ট্রাইকার এবং সুপার সিক্সেস পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। ১৫ বছর বয়সে ছক্কা মারার রেকর্ডে পেছনে ফেলেছেন ক্রিস গেইলকে।
আইপিএল শেষে ভারত ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে ৫ ইনিংসে ২০১ রান করেছেন। ফাইনালে ৯৪ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন। সেখানে শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের বিপক্ষে মাত্র ১১ বলে ফিফটি করে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটের দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড গড়েন বৈভব।
এছাড়া বৈভব ৮টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ১২ ইনিংসে ২০৭ রান করেছেন। যুব টেস্টে ৬টি ম্যাচে ১০ ইনিংসে ৩৩১ রান করেছেন। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ১৩ ম্যাচে ৫৬৪ রান করেছেন, যার মধ্যে একটি ১৯০ রানের ইনিংসও রয়েছে। যুব ওয়ানডেতে ২৫ ম্যাচে ৫৬.৪৮ গড় করে ১৪১২ রান করেছেন, স্ট্রাইক রেট ছিল ১৬৫.৭২। অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ৭ ম্যাচে টুর্নামেন্টের সর্বাধিক ৪৩৯ রান করে দলকে শিরোপাও জিতিয়েছেন। চাইলে এই পরিসংখ্যান আরও লম্বা করা যাবে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার আগেই বৈভব প্রমাণ করেছেন যে তিনি কেবল ধুম-ধাড়াক্কা টি-২০ ব্যাটার নন; টেস্ট, ওয়ানডে সব ফরম্যাটেই তার ব্যাট কথা বলে। তবে এখন লড়াইটা হচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেওয়ার।
বহুল আলোচিত তার অভিষেক ইনিংসটি যদিও প্রতিভার সঙ্গে পুরোপুরি সুবিচার করতে পারেনি। ১০ বলে ২ ছক্কায় স্রেফ ১৪ রান করেছেন। তবে রান যাই হোক, ওল্ড ট্রাফোর্ডে বিশ্ব ক্রিকেটের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গেল। যে মাঠে শচীন টেন্ডুলকার তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, সেই মাঠই এখন বৈভবের জন্য নতুন সূর্য হয়ে উঠেছে।
কিন্তু শুধুমাত্র বয়সের দিক থেকে শচীনকে ছাড়িয়ে গেলে দায়িত্ব শেষ হবে না; মনে রাখতে হবে—শচীন ২৪ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৬৬৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে করেছে ৩৪ হাজার ৩৫৭ রান এবং ১০০টি সেঞ্চুরি। এখন দেখতে হবে, বৈভব সূর্যবংশী কতদূর যেতে পারেন। এই নতুন সূর্যের আলো ক্রিকেট বিশ্বকে কতটা আলোকিত করবে?
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন