প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বন্দরনগরী হোদেইদায় হুথি বিদ্রোহীদের অস্ত্র পাচার কার্যক্রমের ওপর বিমান হামলা পরিচালনা করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) এই হামলাগুলোর ভিডিও প্রকাশ করেছে জোটটি। একই সময়ে, দেশের তাইজ প্রদেশে সরকারি বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে বিভিন্ন রণাঙ্গনে তীব্র লড়াই চলছে। খবরটি এসেছে আরব নিউজ ও রয়টার্সের মাধ্যমে।
জোটের প্রকাশিত প্রায় ছয় মিনিটের সাদা-কালো ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রাক, ছোট নৌযান এবং গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এমন বেশ কয়েকটি স্থাপনায় বিমান হামলার দৃশ্য। ভিডিওটির শুরুতে হামলার তারিখ ও স্থান উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হামলায় কোন ধরনের অস্ত্র বা সরঞ্জাম লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, কিংবা কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে—এই বিষয়ে কোনো তথ্য জানায়নি জোট।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ভিডিওটি প্রকাশ করেন। জোটের দাবি, সমুদ্রপথে ইয়েমেনে অস্ত্র এনে উপকূলে নামানো এবং পরে যানবাহনে করে বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অস্ত্র পাচারে ব্যবহৃত সামুদ্রিক যান, স্থলযান এবং সংগঠিত চোরাচালান চক্রের বিষয়টিও জোটের প্রকাশিত ফুটেজে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে হুথিদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হোদেইদা, যা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত, দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। বর্তমানে শহরটি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে এই বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই, বন্দর ও আশপাশের এলাকায় সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের জন্য পণ্য সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালীও ইয়েমেন সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা। এই জলপথ দিয়ে সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতে পারে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় ও পণ্য পৌঁছানোর সময় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানী সানা দখলের পর থেকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে হুথিদের সংঘাত চলছে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করে। দীর্ঘদিনের এই যুদ্ধে দেশটি রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত কিছুটা কমলেও ২০২৬ সালে নতুন করে লড়াই তীব্র হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুথিদের সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত ও ১৬ জন আহত হন। হুথিরা হামলার দায় স্বীকার করে জানায়, তাদের লক্ষ্য ছিল সৌদি বাহিনীর সামরিক স্থাপনা। এসব হামলা ও পাল্টা সামরিক তৎপরতায় সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশে সরকারি বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে কয়েকটি ফ্রন্টে তীব্র লড়াই চলছে। ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর দাবি, তাইজ শহরের দক্ষিণে আল-শাকাব ফ্রন্টের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে হুথিদের বড় ধরনের আক্রমণ প্রতিহত করা হয়েছে। ভোর থেকে চলা সংঘর্ষে হুথিদের বেশ কয়েকজন যোদ্ধা নিহত বা আহত হয়েছেন বলে সেনাবাহিনী জানিয়েছে। তবে হতাহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, শহরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আল-আকরুদ ফ্রন্টের জাবাল দুহাইহ এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের জাবাল হান ও আশপাশের এলাকায় হুথিদের অগ্রসর হওয়ার চেষ্টাও প্রতিহত করা হয়েছে। একই এলাকার আল-দাবাব ফ্রন্টেও সংঘর্ষ চলছে। এসব অভিযানের বিষয়ে হুথিদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তাইজের বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের অবস্থান, যোদ্ধাদের জমায়েত এবং সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে বলেও জানিয়েছে সরকারি বাহিনী। রয়টার্সের ১৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাইজ শহর ঘিরে হুথিদের সামরিক চাপ বাড়ছে। শহরটির আশপাশে সড়ক যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের সংকটও তীব্র হচ্ছে। প্রদেশটিতে এক লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাইজের ভৌগোলিক অবস্থানও সংঘাতের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। শহরটি দক্ষিণ ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথের কাছে অবস্থিত। এখানে হুথিদের অগ্রগতি হলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব পড়তে পারে। ফলে হোদেইদায় অস্ত্র পাচার কার্যক্রম লক্ষ্য করে জোটের হামলা এবং তাইজে চলমান লড়াই ইয়েমেনের সামরিক পরিস্থিতির নতুন করে অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন