প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নেত্রকোনার বারহাট্টায় প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি বক্স কালভার্টে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধীনে ‘গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত সেতু/কালভার্ট নির্মাণ (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বারহাট্টা উপজেলার আসমা ইউনিয়নের গোড়ল কাউনাই নদীর ওপর আশরাফুলের বাড়ির পাশে ৭ দশমিক ৯৩ মিটার দৈর্ঘ্যের বক্স কালভার্টটি নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজটির দায়িত্ব পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আবির ট্রেডার্স। নথিতে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী হিসেবে মো. রুবেল ভূঁইয়ার নাম রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। সুরকি, জমাট বাঁধা সিমেন্ট, কাদামিশ্রিত পাথর ও ময়লাযুক্ত বালু ব্যবহারের পাশাপাশি ঢালাইয়ে মরিচাধরা রড ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ছয় মাস আগে ঢালাইয়ের প্রস্তুতির সময় সেন্টারিংসহ একটি অংশ ভেঙে পড়ে। এরপরও কাজের গতি ছিল ধীর। এর মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আগাম বিল তুলে নিয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
রোববার (৪ অক্টোবর) পুনরায় সেতুর ঢালাইয়ের কাজ শুরু হলে স্থানীয়রা সেখানে কাদাযুক্ত পাথর ও জমাট সিমেন্ট ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। পরে বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়। খবর পেয়ে বাদ আসর ঘটনাস্থলে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিনা আক্তার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ওবায়েদ উল্লাহ।
ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর চলমান ঢালাইয়ের কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন কর্মকর্তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা সুহেল মিয়া বলেন, ‘এই সেতুতে স্মরণকালের সবচেয়ে বাজে কাজ হয়েছে। মরিচাধরা রডের ওপরও ঢালাই দেওয়া হচ্ছিল।’
আরেক বাসিন্দা আনিস তালুকদার বলেন, ‘আমার বাড়ির কাছেই কাজ হচ্ছে। উপজেলা থেকে কাউকে নিয়মিত তদারকি করতে দেখিনি। পুরো কাজই দুই নম্বর হয়েছে। প্রশাসন এসে কাজ বন্ধ করায় আমরা স্বস্তি পেয়েছি।’
পিআইও ওবায়েদ উল্লাহ বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজের অনিয়ম পেয়েছি। তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত চিঠি দেওয়া হবে।’
ইউএনও সেলিনা আক্তার বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী আমরা কাজটি পরিদর্শনে যাই। কিছু অনিয়মের প্রেক্ষিতে কাজটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’ স্থানীয়দের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও কাদার মধ্যে ঢালাই দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে সরকারি নথিতে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. রুবেল ভূঁইয়ার মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তিনি নিজে কাজটি করছেন না; তার লাইসেন্স ব্যবহার করে তার বড় ভাই আবুল কাজটি করছেন। তবে নথিতে তার নাম থাকায় নিয়ম অনুযায়ী দায়বদ্ধতার বিষয়টি জানানো হলে তিনি তা স্বীকার করেন এবং বিষয়টি নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে খোঁজ নেওয়ার কথা জানান।
অন্যদিকে প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ চলেছে।
পরিদর্শনের সময় স্থানীয়দের ভিডিও ধারণে এক আনসার সদস্য বাধা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আপাতত নির্মাণকাজ বন্ধ হলেও পুরোপুরি আশ্বস্ত নন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, ইতোমধ্যে সেতুর বড় একটি অংশ নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। তাই শুধু কাজ বন্ধ নয়, নির্মিত অংশের গুণগত মানও কারিগরি বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, নির্মাণকাজে অনিয়মের যথাযথ তদন্ত ও ব্যবস্থা না নিলে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই সেতু ভবিষ্যতে এলাকাবাসীর জন্য নিরাপদ যোগাযোগের মাধ্যমের বদলে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন