প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মাথাব্যথা নিয়ে সচেতনতা অনেকের মধ্যে কম দেখা যায়। অন্যান্য রোগের মতো মাথাব্যথাকেও অনেকে তেমন গুরুত্ব দেন না, যতক্ষণ না এটি তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সমস্যা সৃষ্টি করে। মাইগ্রেন একটি বিশেষ ধরনের স্নায়বিক সমস্যা, যা কারণে বারবার তীব্র মাথাব্যথা হতে পারে। সাধারণ টেনশনজনিত মাথাব্যথার তুলনায় মাইগ্রেনের লক্ষণ ও ধরন আলাদা। এটি সাধারণত নির্দিষ্ট বিরতিতে আক্রমণের মতো দেখা দেয়। কারও মাসে একবার, কারও সপ্তাহে একবার, আবার কারও কয়েক মাস পরপর মাইগ্রেনের ব্যথা হতে পারে।
মাইগ্রেন সাধারণত ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে এটি যেকোনো বয়সের মানুষের মধ্যে হতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, ঘুমের অনিয়ম, হরমোনের পরিবর্তন এবং কিছু পরিবেশগত বিষয় মাইগ্রেনের আক্রমণ উস্কে দিতে পারে। যারা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণে দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে মাথাব্যথার সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক পদার্থ, বিশেষ করে সেরোটোনিনের কার্যক্রমের পরিবর্তনও মাইগ্রেনের সঙ্গে সম্পর্কিত। নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের সময় হরমোনের ওঠানামার কারণে মাইগ্রেনের ব্যথা বৃদ্ধি পেতে পারে। জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কারও মাথাব্যথার ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। তাই এ ধরনের ওষুধ ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। মাইগ্রেনের ব্যথা মাঝারি থেকে তীব্র হতে পারে।
সাধারণত মাথার এক পাশে ব্যথা অনুভূত হয়, তবে এটি দুই পাশে হতে পারে। ব্যথা অনেক সময় স্পন্দনের মতো অনুভূত হয় এবং হাঁটাচলা বা শারীরিক পরিশ্রমে বেড়ে যেতে পারে। একটি মাইগ্রেনের আক্রমণ সাধারণত চার থেকে ৭২ ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। এ সময় বমি বমি ভাব, বমি, আলো ও শব্দে অস্বস্তির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি অন্ধকার ও নীরব ঘরে বিশ্রাম নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
কিছু রোগীর মাথাব্যথা শুরুর আগে চোখের সামনে আলোর ঝলকানি, আঁকাবাঁকা রেখা দেখা কিংবা দৃষ্টিতে সাময়িক পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। একে মাইগ্রেনের অরা বলা হয়। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে এমন লক্ষণ থাকে না। প্রথমবার এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে বা হঠাৎ দৃষ্টির সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
মাইগ্রেনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে কিছু অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিয়মিত খাবার খাওয়া
দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকলে কারও মাইগ্রেনের আক্রমণ শুরু হতে পারে। তাই নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া উচিত। সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে এবং অতিরিক্ত ক্ষুধার্ত থাকা এড়িয়ে চলতে হবে। রক্তের শর্করার ওঠানামা এড়াতে দীর্ঘ সময় খাবার বাদ না দেওয়াই ভালো।
ঘুমের নিয়ম বজায় রাখা
প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতিদিন সাত থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন। রাত জাগা, ঘুম কম হওয়া কিংবা অতিরিক্ত ঘুম–কোনোটিই কারও কারও ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের আক্রমণ বাড়াতে পারে। ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের পর্দায় তাকিয়ে থাকার অভ্যাস কমানো ভালো।
খাবার ও পানীয় সম্পর্কে সচেতন থাকা
সবার ক্ষেত্রে একই খাবার মাইগ্রেনের কারণ হয় না। কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্যাফেইন, আবার কারও ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট খাবার মাথাব্যথা বাড়াতে পারে। তাই কোন খাবার খেলে সমস্যা হয়, তা খেয়াল রাখা জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সব ধরনের চিনি বা খাবার একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন।
কম্পিউটার ব্যবহারে বিরতি
দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে চাপ, ক্লান্তি ও মাথাব্যথা বাড়তে পারে। কাজের ফাঁকে নিয়মিত বিরতি নিন, চোখকে বিশ্রাম দিন এবং কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করুন। পর্যাপ্ত আলোতে কাজ করা ও সঠিকভাবে বসার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
পানিশূন্যতা এড়িয়ে চলা
শরীরে পানির ঘাটতি কিছু মানুষের মাইগ্রেনের আক্রমণ উস্কে দিতে পারে। বিশেষ করে গরমে, বাইরে কাজ করার সময় বা শারীরিক পরিশ্রমের পর পর্যাপ্ত পানি পান করুন। প্রয়োজন অনুযায়ী ডাবের পানি বা অন্যান্য পানীয় নেওয়া যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনি মেশানো কোমল পানীয় কম পান করাই ভালো।
আবহাওয়া ও মানসিক চাপ সামলানো
অতিরিক্ত গরম, তীব্র রোদ, আর্দ্রতার পরিবর্তন কিংবা আবহাওয়ার ওঠানামা কারও কারও মাইগ্রেনের সমস্যা বাড়াতে পারে। বাইরে গেলে ছাতা ব্যবহার করুন, গরমে দীর্ঘক্ষণ থাকা এড়িয়ে চলুন এবং নিয়মিত বিশ্রাম নিন। মানসিক চাপ কমাতে হাঁটাচলা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ও পছন্দের কাজে সময় দেওয়াও উপকারী হতে পারে।
মাইগ্রেনের আক্রমণ কখন, কতক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে এবং তার আগে কী খাওয়া, কতক্ষণ ঘুমানো বা কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া হয়েছে–এসব লিখে রাখলে সম্ভাব্য কারণ শনাক্ত করতে সুবিধা হয়। তবে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলেই সবার মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে আসে না; কারও নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে।
দীর্ঘদিন মাইগ্রেনে ভুগলে কাজ, ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সাধারণত ব্যথা কমানোর ওষুধ দেওয়া হলেও অতিরিক্ত বা ঘন ঘন এসব ওষুধ সেবনে উল্টো মাথাব্যথা বেড়ে যেতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
হঠাৎ জীবনের সবচেয়ে তীব্র মাথাব্যথা শুরু হলে, হাত-পা দুর্বল হয়ে গেলে, কথা বলতে সমস্যা হলে, অজ্ঞান হয়ে পড়লে, জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে গেলে কিংবা মাথায় আঘাতের পর তীব্র ব্যথা হলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। মাইগ্রেনের লক্ষণ বারবার দেখা দিলে বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা গ্রহণ করা জরুরি। পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না।
[সহকারী রেজিস্ট্রার, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল]
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন