প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নিউজিল্যান্ডের সাবেক কোস্টগার্ড সদস্য অ্যাডওয়ার্ড পুডনির বাংলাদেশে আসার ঘটনা ২০২৪ সালের আগে ঘটে। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী বেলা, ১৬ বছর বয়সী সন্তান আলবার্ট ও ছোট ছেলে রালফ। প্রায় দুই বছর ধরে তারা বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থান করছিলেন। তাদের স্বপ্ন ছিল, এখানে তৈরি করা নৌযানটির মাধ্যমে সাগরপথে নিজ দেশে ফিরে যাবেন।
কক্সবাজারের স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় প্রায় দুই বছরের প্রচেষ্টায় ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামের নৌযানটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এতে ব্যয় হয়েছিল এক কোটি টাকার বেশি।
কিন্তু গত ২৫ আগস্ট কক্সবাজারের সোনাদিয়া চ্যানেলে বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের কারণে নৌযানটি ডুবে যায়। স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় অ্যাডওয়ার্ড, তার স্ত্রী বেলা ও ছোট ছেলে রালফ প্রাণে বেঁচে যান। তবে তাদের ১৬ বছর বয়সী সন্তান আলবার্ট নিখোঁজ হয় এবং ৩২ ঘণ্টা পর সমুদ্রের উপকূলে তার মরদেহ ভেসে ওঠে।
আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর ১৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এরপর থেকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে হোটেল শৈবালে অবস্থান করছিলেন পরিবারের বেঁচে যাওয়া সদস্যরা।
প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে তারা নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। বাবা, মা ও ছোট ছেলে ফিরলেও আলবার্ট আর ফিরছে না। তাদের স্বপ্নের নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’ এখন বাঁকখালী নদীতে ডুবন্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
অ্যাডওয়ার্ড ও তার পরিবারের বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ তৈরি করা হয়েছিল। কক্সবাজারের স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় নৌযানটি নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল।
স্থানীয় বিএনপি নেতা দিদারুল ইসলাম রুবেল জানিয়েছেন, নৌযানটিতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ ও রান্নাঘরসহ বিভিন্ন সুবিধা ছিল। এটি ব্যক্তিগত অ্যাডভেঞ্চার ও সমুদ্রভ্রমণের জন্য উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল। নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল এক কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা করা হয়।
স্থানীয় জেলে আবদুর রহমান জানান, দুটি কাঠের নৌযান জোড়া দিয়ে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ তৈরি করা হয়েছিল। তার মতে, বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌযানটির সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রথমে একটি অংশ দ্রুত ডুবে যায়, এরপর কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য অংশটিও তলিয়ে যায়।
দীর্ঘদিন ধরে বাঁকখালী নদীতে নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীত পাশে নোঙর করা ছিল নৌযানটি। দুর্ঘটনার পর সেটি ডুবন্ত অবস্থায় সেখানেই পড়ে রয়েছে।
নৌকাডুবির কয়েক মাস আগে, ওই নৌযানে ঘুরতে গিয়ে বিপদের মুখে পড়েছিল নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল রাতে কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া চরে তাদের ওপর হামলা চালায় একদল দুষ্কৃতকারী। পরদিন ৯ এপ্রিল কোস্টগার্ডের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার কথা জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, অ্যাডওয়ার্ড পরিবারসহ সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাঠের নৌযানে সমুদ্রযাত্রার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারা।
নিরাপত্তার ঝুঁকি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পরিবারটিকে এ ধরনের সমুদ্রযাত্রা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছিল। ১ মার্চ তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনাও দেয়া হয়। তবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তারা সোনাদিয়া চরে নৌযানসহ অবস্থান করছিলেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
হামলার খবর পেয়ে কোস্টগার্ডের একাধিক দল ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযান চালায় এবং পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করে।
নদীতে পড়ে আছে ‘আইল্যান্ড গার্ল’
বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন নিয়ে তৈরি করা ‘আইল্যান্ড গার্ল’ এখন বাঁকখালী নদীতে ডুবন্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আর পরিবারের ১৬ বছর বয়সী আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে কক্সবাজারে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছিলেন, আলবার্টের মরদেহ উদ্ধারের পর আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। পরে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাস ও পরিবারের সম্মতি নিয়ে পুলিশের উপস্থিতিতে কক্সবাজারে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
যাত্রাটি শুরু হয়েছিল চারজনের নিয়ে, কিন্তু শেষ হলো তিনজনের দেশে ফেরা এবং একজনের চিরবিদায়ে। হয়তো কোনো একদিন বাঁকখালী নদী থেকে উদ্ধার করা হবে ‘আইল্যান্ড গার্ল’। কিন্তু পরিবারের হারানো সন্তান আর ফিরবে না। একসঙ্গে বিশ্বভ্রমণ শেষে দেশে ফেরার স্বপ্নটিও আর পূরণ হবে না।
হোটেল শৈবালে শেষ ৫০ দিন
নৌকাডুবির পর থেকে কক্সবাজারের হোটেল শৈবালে ছিলেন অ্যাডওয়ার্ড ও তার পরিবারের অন্য দুই সদস্য। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে তাদের থাকা-খাওয়া ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়। নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে পুলিশ প্রশাসন।
বিদায়ের আগে হোটেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সময় কাটান পরিবারের সদস্যরা। একসঙ্গে ছবি তোলেন তারা। দীর্ঘদিনের আন্তরিক সম্পর্কের স্মারক হিসেবে তাদের হাতে দেশীয় পণ্য উপহার হিসেবে তুলে দেয় হোটেল কর্তৃপক্ষ।
পর্যটন করপোরেশনের হোটেল শৈবাল ও মোটেল লাবণীর ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদ সময় সংবাদকে জানান, ২৫ আগস্ট নৌকাডুবির পর উদ্ধার হওয়া নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের জেলা প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় হোটেল শৈবালে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এ সময়ে তাদের খাবার, আবাসন ও লন্ড্রি সেবাসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।
রায়হান উদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন একসঙ্গে অবস্থানের কারণে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হোটেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। দুর্ঘটনার পরও বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা নিয়ে তারা দেশে ফিরছেন বলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন তিনি।
বিদায় উপলক্ষে বাংলাদেশি ঐতিহ্য ও দেশীয় পণ্য তুলে ধরতে হোটেলের পক্ষ থেকে তাদের স্মারক উপহার দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
যেভাবে হলো ফেরা
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, নৌকাডুবির পর জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের থাকা-খাওয়া ও সার্বিক বিষয়ে পর্যটন করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও সহযোগিতা করেছেন।
তিনি সময় সংবাদকে বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে দেশে ফেরানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রথমে ৯ অক্টোবর তাদের ফেরার কথা থাকলেও পাসপোর্ট, ভিসা ও বিমান টিকিটসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগে। সব প্রক্রিয়া শেষে ১৪ অক্টোবর তাদের দেশে ফেরার দিন নির্ধারণ করা হয়।
তাসনীম জাহান আরও বলেন, দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা কাটিয়ে পরিবারের সদস্যরা যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সেটিই জেলা প্রশাসনের প্রত্যাশা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন