প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিশ্বের দ্রুততম সুপারকম্পিউটারের মর্যাদাপূর্ণ তালিকার প্রথম স্থানে চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে অর্জন করেছে শীর্ষ স্থান। বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এই বিজয়ের প্রমাণ হিসেবে কাজ করছে।
জার্মানির হামবুর্গে মঙ্গলবার প্রকাশিত হওয়া ষাণ্মাসিক তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার সিস্টেমের খেতাব চীনের 'লাইনশাইন' অর্জন করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের 'এল ক্যাপিটান'কে পেছনে ফেলেছে।
নতুন 'টপ৫০০' তালিকা অনুযায়ী, চীনের শেনঝেন শহরের ন্যাশনাল সুপারকম্পিউটিং সেন্টারে অবস্থিত লাইনশাইন ২.১৯৮ এক্সাফ্লপসের পারফরম্যান্স অর্জন করেছে, যা প্রতি সেকেন্ডে ২ কুইন্টিলিয়নের বেশি হিসাব-নিকাশ করতে সক্ষম। এই পারফরম্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের এল ক্যাপিটানের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি।
২০১৭ সালের 'সানওয়ে তাইহুলাইট'-এর পর এই প্রথম চীনের কোনো সুপারকম্পিউটার সিস্টেম এই তালিকার শীর্ষে উঠেছে। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে এল ক্যাপিটান শীর্ষ স্থানে ছিল, যা ক্যালিফোর্নিয়ার লিভারমোরের লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে অবস্থিত।
নতুন তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির 'ফ্রন্টিয়ার' তৃতীয় স্থানে রয়েছে। চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে যথাক্রমে ইলিনয়ের আর্গন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির 'অরোরা' এবং জার্মানির জুলিখ সুপারকম্পিউটিং সেন্টারের 'জুপিটার' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
শীর্ষ ২০-এর তালিকায় যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, নেদারল্যান্ডস এবং সুইজারল্যান্ডের মতো অন্যান্য দেশেরও অন্তর্ভুক্তি রয়েছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীনের প্রগতির কাহিনী
top500 তালিকার অন্যতম আয়োজক এবং টেনেসি ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের ইমেরিটাস অধ্যাপক জ্যাক ডংগারা বলেন, 'সল্যাবেশনের সর্বাধুনিক চিপের ওপর মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ থাকার পরও লাইনশাইন-এর পূর্বোক্ত পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যে চীন উন্নত কম্পিউটিংয়ে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম।'
ডংগারা আল-জাজিরাকে বলেছেন, 'মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে কিছু উন্নত যন্ত্রাংশ পাওয়ার ক্ষেত্রে চীনের হয়তো কিছু সময় লাগবে, কিন্তু এটি তাদের নিজস্ব দেশীয় বিকল্প তৈরি করতে জোরালোভাবে উৎসাহিত করছে।'
তিনি বলেন, চীনের শীর্ষস্থান দখলের খবরে তিনি 'পুরোপুরি অবাক হননি'। আসলে তিনি উল্লেখ করলেন, 'দীর্ঘমেয়াদে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো চীনের গতি কিছুটা ধীর করতে পারে, তবে প্রযুক্তিগতভাবে স্বনির্ভর হওয়ার জন্য তাদের চেষ্টা ত্বরান্বিত করবে।'
লাইনশাইন কার্যপদ্ধতি
অন্যান্য সুপারকম্পিউটারের তুলনায় লাইনশাইন-এর একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে পুরোপুরি সাধারণ কাজের জন্য তৈরি 'সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট' বা সিপিইউ-এর ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।
সাধারণত, সিপিইউতে প্রসেসিং কোর কম থাকে, যা চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল চালানোর জন্য 'গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট' বা জিপিইউ-এর চেয়ে ধীরগতির হয়।
টপ৫০০ তালিকার তথ্য অনুযায়ী, লাইনশাইনই প্রথম এবং একমাত্র সিস্টেম, যা শুধুমাত্র সিপিইউ ডিজাইন ব্যবহার করে ২ এক্সাফ্লপসের বেশি পারফরম্যান্স অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
১৯৯৩ সালে একটি সম্মেলনের জন্য কম্পিউটার বিজ্ঞানী এরিখ স্ট্রোমায়ার এবং হ্যান্স মেউয়ার সুপারকম্পিউটারগুলোর তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন। এরপর থেকে প্রতিবছর দুবার এই তালিকা প্রকাশ করা হয়।
'লিনপ্যাক বেঞ্চমার্কের' ভিত্তিতে এই তালিকায় সুপারকম্পিউটারগুলোর সক্ষমতার র্যাংকিং করা হয়। এটি মূলত একটি জটিল লিনিয়ার ইকুয়েশন সমাধান করতে কত সময় লাগে, তা পরিমাপ করে।
২০১৯ সালে তালিকায় প্রায় অর্ধেকই চীনের দখলে ছিল। কিন্তু ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হবার পরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
র্যাংকিংয়ের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন
টপ৫০০ তালিকা বেশ কয়েক দশক ধরে প্রভাবশালী হলেও কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এআইয়ের আবির্ভাবের পর কম্পিউটিং প্রক্রিয়ায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার কারণে র্যাংকিংয়ের গুরুত্ব কিছুটা কমেছে।
মাইক্রোসফট এবং অ্যামাজনের মতো করপোরেট প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো এআইয়ের উন্নতিতে এগিয়ে আছে। অথচ টপ৫০০ তালিকায় সরকারি ও একাডেমিক উদ্যোগে তৈরি সুপারকম্পিউটার স্থান পেয়েছে। এরা স্বেচ্ছায় এই তালিকায় অংশ নিয়েছে।
২০১৫ সালের একটি গবেষণাপত্রে কর্নেল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা মন্তব্য করেছিলেন, এল ক্যাপিটান প্রকৃতপক্ষে 'এক্সএআই'-এর কলোসাস সুপারকম্পিউটিং ক্ষমতার মাত্র ২২ শতাংশ অর্জন করতে পেরেছে।
অধ্যাপক ডংগারা বলছেন, এই তালিকা কেবল একটি 'বেঞ্চমার্ক' এর ভিত্তিতে পারফরম্যান্স মাপার জন্য, তাই এটিকে 'প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের সম্পূর্ণ মাপকাঠি' হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, 'বৈজ্ঞানিক প্রয়োগের ক্ষমতা, জ্বালানি সাশ্রয়, সফটওয়্যারের মান, নির্ভরযোগ্যতা, ব্যবহার সহজতা এবং গবেষক সম্প্রদায়কে সহায়তা করার ক্ষমতাও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।'
কম্পিউটিং শিল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'ইন্টারসেক্ট৩৬০ রিসার্চ'-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যাডিসন স্নেল জানান, লাইনশাইনের সক্ষমতা নিয়ে তিনি অবাক হননি। কিন্তু চীনা ডেভেলপারদের আবারও এই র্যাংকিংয়ে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তটাই সবচেয়ে লক্ষণীয়।
স্নেল আল জাজিরাকে বলেন, 'বিশ্বের শীর্ষ সুপারকম্পিউটার হিসেবে লাইনশাইনের স্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং জাপানের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। কারণ দেশগুলো এআইতে আধিপত্য বিস্তার করার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রযুক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বজুড়ে এগিয়ে আছে, তবে ব্যবধানটা খুব একটা বেশি নয়। বিবর্তনের এই দ্রুত গতির কারণে বৈশ্বিক চিত্র খুব তাড়াতাড়ি বদলে যেতে পারে। সুপারকম্পিউটিং এবং এআই-এর ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো "ডিজিটাল সার্বভৌমত্ত্ব"। প্রতিটি অঞ্চলই এখন নিজস্ব সম্পদ এবং সক্ষমতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।'
এআইয়ের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এখন তীব্র লড়াইয়ে মেতে রয়েছে। একে অপরের অগ্রগতি ঠেকাতে, ওয়াশিংটন এবং বেইজিং পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
গত এপ্রিল মাসে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত '২০২৬ এআই ইনডেক্স রিপোর্ট' অনুযায়ী, এআই মডেল পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্যবধান 'কার্যত কমিয়ে এনেছে' চীন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে অধিকতর উন্নত এআই মডেল তৈরি করছে, সেখানে পেটেন্ট তৈরি এবং শিল্পক্ষেত্রে রোবট স্থাপনের দিক থেকে চীন অগ্রহণ করছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন