প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের পরিবেশ মাদক ব্যবসার দ্বন্দ্ব, আধিপত্যের লড়াই এবং রক্তাক্ত সংঘর্ষের ভয়ের গল্পে ভরা। এখানে অপরাধের জগতে কার রাজত্ব থাকবে এবং কে পালাবে, তা নিয়ে চলে নাটক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানও থেমে থাকে না। তবে মাদকের কারবার রহস্যজনকভাবে বন্ধ হয় না।
এক সময়ের গডফাদার ইশতিয়াকের হাত ধরে অপরাধের জগতে প্রবেশ করে রাজা, যিনি ‘পিচ্চি রাজা’ নামে পরিচিত। পুলিশে সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করলেও পরে সে ক্যাম্পের আতঙ্ক হয়ে ওঠে এবং শীর্ষ মাদকসম্রাটে পরিণত হয়।
গত ১৯ মে, নেপাল থেকে ঢাকায় ফেরার পর পিচ্চি রাজাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মাত্র ২৭ বছর বয়সে তার বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে। মোহাম্মদপুর থানায় মামলার সংখ্যা ২৯টি, যার মধ্যে তিনটি হত্যা, সাতটি হত্যাচেষ্টা, চারটি বিস্ফোরক এবং ১৩টি মাদকের মামলা অন্তর্ভুক্ত। গত ২৭ সেপ্টেম্বর, ঢাকার আদালত থেকে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পথে গাজীপুরের নাওজোড় এলাকায় টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান তিনি। এই ঘটনায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পাঁচ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এরপর থেকে পিচ্চি রাজা ফের আলোচনায় এসেছে।
গ্রেফতারের পর পিচ্চি রাজা পুলিশের কাছে তার অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ার কাহিনী বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, শুরুতে তিনি পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। আয় কম হওয়ায় পরে একটি গ্যাস পাম্পে চাকরি নেন। সেখানে তার আয় ছিল প্রায় তিন হাজার টাকা। কিন্তু এক ঘটনায় চাকরি হারানোর পর আবার ক্যাম্পে ফিরে আসেন। ২০১৮ সালে পুলিশি অভিযানের সময় তাকে আটক করা হয়। ওই অভিযানে তার কাছ থেকে কিছু না পেলেও তার বিরুদ্ধে ৫১ পিস ইয়াবার মামলা দেওয়া হয়। এটি ছিল তার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা। প্রায় দুই মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে মাদক বিক্রি শুরু করেন। প্রথমে অল্প পরিমাণ মাদক কিনে বিক্রি করতেন এবং এতে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টাকা আয় হতো। পরে আবার কারাগারে গেলে অপরাধীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। বেরিয়ে এসে মাদক কারবারে যুক্ত হন। পিচ্চি রাজা পুলিশকে বলেন, এক পর্যায়ে সে নিজেই মাদক ব্যবসা শুরু করে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ২০১৪ সালের পর অল্প বয়সেই ক্যাম্পের মাদক কারবারি ইশতিয়াকের সঙ্গে যুক্ত হন রাজা। একই সময় বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স হিসেবেও কাজ করতেন তিনি। ফলে ক্যাম্পের অপরাধজগতের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ তৈরি হয়। ২০২০ সালে করোনায় ইশতিয়াকের মৃত্যুর পর ক্যাম্পের একটি অংশের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ তার হাতে আসে।
পিচ্চি রাজা একপর্যায়ে টেকনাফ থেকে মাদকের চালান এনে ক্যাম্পে সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে পিচ্চি রাজার সঙ্গে বুনিয়া সোহেলসহ কয়েকটি গ্রুপের বিরোধ তীব্র হয়। মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণ, এলাকার লাইনম্যান নিয়োগ, অর্থ আদায় এবং আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। পিচ্চি রাজা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন, ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পের সবাই নিজেদের অবস্থান থেকে ‘রাজত্ব’ নিতে চেয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে। ক্যাম্পে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে বুনিয়া সোহেলের নাম বারবার উচ্চারিত হয়েছে পিচ্চি রাজার বক্তব্যে। বুনিয়া সোহেল এমন অবস্থান চেয়েছিলেন যেখানে ক্যাম্পে তার ওপর আর কেউ থাকবে না। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা তাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, বুনিয়া সোহেলের ওপর হামলা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের পর ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণে নতুন করে পিচ্চি রাজার প্রভাব বাড়ে। গত বছর অক্টোবরে বুনিয়া সোহেলের আস্তানায় হামলা ও লুটপাটের সময় পিচ্চি রাজাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে প্রভাব বিস্তারের কথা বলতে শোনা গেছে। পিচ্চি রাজার বিরুদ্ধে মাদক কারবারের পাশাপাশি বিপুল অর্থ-সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন পারিবারিক ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। তার শ্বশুর খোরশেদ, শালা নয়ন এবং ফুফাতো ভাই রনিসহ কয়েকজন আত্মীয় এ অর্থের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তার ২৫ থেকে ৩০টি সিএনজিচালিত অটো এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পত্তি রয়েছে।
পিচ্চি রাজার সঙ্গে মাদক কারবার ও অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে আদি, নবাব, শাহজাদা, ফাইজান, বেলুন, রুবেল, রনি, নাটা সুমন, সুজন, ব্যাটারি কামরান, হীরা ও মঈন পিচ্চিসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তারা মাদক সরবরাহ, অর্থ আদায়, দখল নিশ্চিত করা এবং প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানোর কাজে যুক্ত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু অপরাধী সোর্স হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে পরে সেই পরিচয়কে নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের কাজে ব্যবহার করে। ফলে একজন অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও তার জায়গায় আরেকজনের উত্থান ঘটে। তবে এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, ‘কে আমাদের সোর্স আর কে আমাদের সোর্স নয়, এটা আমাদের কাছে মুখ্য বিষয় নয়। তিনি অপরাধী কি না, সেটাই আমাদের কাছে প্রধান বিষয়।’ তিনি বলেন, ক্যাম্পের সব অপরাধীকে গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চলছে। পিচ্চি রাজাকে গ্রেফতারে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে।
পিচ্চি রাজার খোঁজে থানায় মামলা
যুগান্তর প্রতিবেদন, গাজীপুর জানান, দুদিন পার হলেও খোঁজ নেই পিচ্চি রাজার। এ ঘটনায় গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানায় মামলা করা হয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার হোসেন জানান, থানার উপপরিদর্শক বিশ্বজিৎ মজুমদার বাদী হয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে কোনাবাড়ী থানায় মামলা করেছেন। মামলার একমাত্র আসামি পিচ্চি রাজা। তাকে গ্রেফতারে পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন