প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ হিসেবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এরিক টেন হ্যাগ। দুইজনের সম্পর্কের অবনতি এতটাই তীব্র হয়েছিল যে, রোনালদো ব্রিটিশ ব্রডকাস্টার পিয়ার্স মরগানের অনুষ্ঠানে গিয়ে কোচের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। এই সংঘাতের ফলস্বরূপ রোনালদো ওল্ডট্রাফোর্ড ত্যাগ করে সৌদি ক্লাব আল নাসরে যোগ দেন। পরে টেন হ্যাগও ইউনাইটেড ছাড়তে বাধ্য হন।
সময়ের পরিবর্তনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ক্লাবের প্রাক্তন খেলোয়াড় মাইকেল ক্যারিক। গত মৌসুমে কিছু আশা দেখা গেলেও, চলতি মৌসুমে ক্যারিকের অধীনে রেড ডেভিলরা দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। একই সময়ে, ইউনাইটেডে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন টেন হ্যাগ। তিনি রোনালদোকে সমালোচনা করে বলেন, একসঙ্গে কাজ করার সময় রোনালদো পুরোপুরি ফিট ছিলেন না এবং দলের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি ছিল কম।
২০২১ সালে জুভেন্টাস ছেড়ে আসার পর রোনালদো মাঠে আগের মতো পারফর্ম করতে পারছিলেন না বলেও মন্তব্য করেছেন ইউনাইটেডের এই ডাচ কোচ। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী রোনালদোর শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে কঠোর পরিশ্রমের যে পরিচিতি রয়েছে, সেটিও টেন হ্যাগের মতে পুরোপুরি সত্য নয়।
জুভেন্টাস থেকে ২০২১ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে দ্বিতীয়বার যোগ দেন রোনালদো। ওলে গুনার সুলশার ও টেন হ্যাগের অধীনে ৫৪ ম্যাচে ২৭ গোল করেন তিনি। তবে ইউনাইটেডে টেন হ্যাগের দায়িত্বের শেষের দিকে দুজনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বেশ কয়েকবার রোনালদোকে শুরুর একাদশের বাইরে রাখা হয়।
২০২২ সালের নভেম্বরে পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টেন হাগের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ তুলেছিলেন রোনালদো। তিনি ক্লাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও সমালোচনা করেন। এরপর ইউনাইটেড রোনালদোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে।
বর্তমানে ডাচ ক্লাব এফসি টোয়েন্টির টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন টেন হ্যাগ। তিনি ইউনাইটেডে কাটানো সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইএসপিএন নেদারল্যান্ডসের ‘গুড মর্নিং এরেডিভিসি’ অনুষ্ঠানে আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ হলো দলকে কার্যকরভাবে গড়ে তোলা, সবসময়। প্রত্যেক খেলোয়াড় গুরুত্বপূর্ণ এবং জিততে হলে সেরা খেলোয়াড়দের প্রয়োজন। বড় দলগুলোকে তাদের সেরা খেলোয়াড়কে রাখতে হয়। কিন্তু সেই সেরা খেলোয়াড়কেও দলের জন্য কাজ করতে হবে। রোনালদোর ক্ষেত্রে সমস্যা ছিল এখানেই।’
টেন হ্যাগ আরও বলেন, ‘খেলোয়াড়েরা তার জন্য খেলতে চাইত এবং তাকে অনেক সম্মান করত। এতে কোনো ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ নেই। সে নিঃসন্দেহে অসাধারণ একজন খেলোয়াড়, সর্বকালের অন্যতম সেরা। কিন্তু গত সাত-আট বছরে সে আগের মতো পারফর্ম করতে পারছিল না। জুভেন্টাস ছাড়ার সময় থেকেই তার সেই অধ্যায় শেষ হয়ে গিয়েছিল।’
রিয়াল মাদ্রিদের উদাহরণ টেনে টেন হ্যাগ বলেন, কোনো খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের অবনতি শুরু হলে কখন বিদায় জানাতে হয়, সেটি স্প্যানিশ ক্লাবটি ভালোভাবে জানে। তিনি বলেন, ‘রিয়াল মাদ্রিদের বড় কৃতিত্ব হলো, তারা সবসময় সঠিক সময়ে খেলোয়াড়দের বিদায় জানাতে পারে। তারা বুঝতে পারে কখন একজন খেলোয়াড়ের মান কমতে শুরু করেছে। বাইরের মানুষের কাছে যখন সেই খেলোয়াড়কে এখনো নিজের সেরা সময়ে মনে হয়, তখনই তারা বিদায় জানায়। কিন্তু বাস্তবে সে আর আগের মতো পারফর্ম করতে পারে না।’
৩৬ বছর বয়সে প্রিমিয়ার লিগে ফেরার পর রোনালদো প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের ওপর চাপ তৈরি করতে না পারায় সমালোচিত হন। তবে টেন হ্যাগ তার বয়সকে শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না। বরং তিনি দাবি করেন, রোনালদো ব্যথা উপেক্ষা করে কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছিলেন।
টেন হ্যাগ বলেন, ‘আমি স্বাভাবিকভাবেই তাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিলাম। দায়িত্ব নেওয়ার আগে তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আমরা কীভাবে খেলব, সেখানে তার ভূমিকা কী হবে, তার কাছ থেকে আমার প্রত্যাশা কী এবং আমার ও দলের কাছ থেকে সে কী আশা করতে পারে; সবকিছুই ব্যাখ্যা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের দায়িত্বটাও পালন করতে হয়। আর সে নিজেকে আর সর্বোচ্চ সীমায় নিয়ে যেতে পারছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগেই বলেছি, ব্যথা উপেক্ষা করে নিজেকে নিংড়ে দেওয়া, প্রতিদিন সর্বোচ্চ পরিশ্রম করা এবং ফিট থাকার জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুশীলন করার মানসিকতা তার আর ছিল না। প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে খেলতে হলে ফিট না থাকলে আপনার কোনো সুযোগ নেই।’
রোনালদোর ফিটনেস ধরে রাখার প্রতি নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে টেন হ্যাগ বলেন, ‘বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়, তবে মানুষের মধ্যে এমন ধারণাই রয়েছে। আর এভাবেই সে এত ভালো খেলোয়াড় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আর সেই পরিশ্রমটা করতে পারছিল না।’
‘আপনি যদি সেটা করতে না পারেন, তাহলে প্রিমিয়ার লিগের বাস্তবতা আপনাকে ছাড় দেবে না। তখন আপনি আর প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবেন না, বক্সে পৌঁছাতে পারবেন না। সুযোগ পেলে সে এখনো ফিনিশিং করতে পারে, সেটা দেখা যায়। কিন্তু প্রিমিয়ার লিগের শারীরিক সক্ষমতা ও খেলার তীব্রতার সঙ্গে তাল মেলানো তার পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। এর জন্য ফিট থাকা প্রয়োজন,’–টেন হ্যাগ যোগ করেন।
রোনালদো গোল করার পর কখনো তাকে নিয়ে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে টেন হ্যাগ বলেন, ‘সেটা ঘটেনি। ব্যক্তিগত কিছু কারণে সে অনেক দেরিতে দলে যোগ দিয়েছিল। তত দিনে মৌসুম শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং শুরু থেকেই সবকিছু ভুল পথে এগোতে থাকে। সে ফিট ছিল না এবং নিজের সেরাটা দিতে পারছিল না।’
তবে রোনালদোর সামগ্রিক ক্যারিয়ারের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন টেন হ্যাগ। তার মতে, ফুটবলে রোনালদোর অবদান অনেক। তবে ওল্ড ট্রাফোর্ডে দলের স্বার্থে তাকে নিয়ে কঠোর ও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
গত অক্টোবরে আন্তর্জাতিক বিরতিতে পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে মাঠ ছাড়ার ঘটনায় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন রোনালদোকে ৩০ দিনের জন্য নিষিদ্ধ করে। পাশাপাশি তাকে ২৫৫ ইউরো জরিমানাও করা হয়। তবে ভবিষ্যতে পর্তুগালের হয়ে খেলার জন্য তিনি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে টেন হ্যাগও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো খেলোয়াড়ই ক্লাব বা দেশের চেয়ে বড় নয়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও নয়, লিওনেল মেসিও নয়। শেষ পর্যন্ত দলই সবার আগে। প্রতিটি বড় দলকে তার সেরা খেলোয়াড়কে আপন করে নিতে হবে। কিন্তু সেই সেরা খেলোয়াড়কেও দলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। সে যদি তা না করে, তাহলে সাফল্য আসতে পারে না, কখনোই আসবে না। তখন সবকিছু থেমে যায়।’
মেসির উদাহরণ টেনে টেন হ্যাগ বলেন, ‘আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি যেভাবে খেলেছে, সেটিও ছিল অসাধারণ দেখার মতো। তবে এর জন্য মেসিকেও অনেক কিছু দিতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সবাই তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে, সবাই তার জন্য কাজ করেছে। কিন্তু মেসিও দলকে বিশাল কিছু ফিরিয়ে দিয়েছে।’
গত মাসে দ্য অ্যাথলেটিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও রোনালদোর সঙ্গে নিজের টানাপোড়েনের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছিলেন টেন হ্যাগ।
ইউনাইটেড ছাড়ার পর দুই বছর সাক্ষাৎকার দেওয়ার বিষয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইএসপিএনকে তিনি বলেন, ‘সাক্ষাৎকার দেওয়ার অনুমতি ছিল, তবে ক্লাবের ক্ষতি হয় এমন কিছু বলা যাবে না। যদিও আমি এমনিতেও কখনো তা করতাম না, সেটা বলাই বাহুল্য।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন