প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফেনী শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন, সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন এবং নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ফেনী পৌরসভায় প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল, যা বর্তমানে কার্যত ধীরগতির কবলে পড়েছে। প্রকল্পের আওতায় আরসিসি ড্রেন, আরসিসি সড়ক, কার্পেটিং, ফুটপাতসহ মোট ৬ হাজার ৭২ মিটার অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা থাকলেও, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই কম দেখা যাচ্ছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর। চুক্তি অনুযায়ী, পুরো কাজটি ২০২৭ সালের ৩০ জানুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্প শুরুর প্রায় এক বছর পূর্ণ হতে চললেও, সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে যে সার্বিক কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫ পার্সেন্ট। অথচ প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে।
শহরের ব্যস্ততম শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কের কাজ, যা প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এখনো শুরু হয়নি। সড়কটির দুই পাশ এবং ফুটপাত মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৬৬০ মিটার উন্নয়নকাজ প্রকল্পের মূল অংশের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এতদিনেও ওই অংশে কার্যকরভাবে কাজ শুরু না হওয়ায় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, পথচারী ও বাসিন্দারা বলছেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে একসঙ্গে উন্নয়নকাজ শুরু হলে সাময়িক দুর্ভোগ হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হলে মানুষ তা মেনে নেয়। কিন্তু কাজের গতি যদি ধীর হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের কারণে চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে জনদুর্ভোগ বহুগুণ বেড়ে যায়। ইতোমধ্যে প্রকল্পের বিভিন্ন এলাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
প্রকল্পের কাজের কারণে শহরের গুরুত্বপূর্ণ ডাইভারশন সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত ডাক্তারপাড়া সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১৫ দিন ধরে সড়কটি বন্ধ থাকায় বিকল্প পথে চলাচল করতে গিয়ে যানবাহন ও পথচারীদের ভোগান্তি বেড়েছে।
তাদের আশঙ্কা, যে গতিতে কাজ চলছে, তাতে সড়কটির কাজ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে আরও কয়েক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় সড়কটি বন্ধ থাকলে শহরের যান চলাচলে চাপ আরও বাড়বে।
এদিকে প্রকল্পের বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্যবহৃত সামগ্রীর মান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্পের কিছু অংশে নিম্নমানের রড ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ব্যবহৃত কিছু রডে মরিচা ধরে লালচে হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও নজরে এসেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
ড্রেন নির্মাণের ক্ষেত্রে দুই পাশে পাথর ব্যবহার করে সিসি ঢালাই দেওয়া হলেও সেটির মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং ঢালাইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিতভাবে তদারকি করা প্রয়োজন।
প্রকল্প এলাকায় সরেজমিনে পর্যাপ্ত শ্রমিক না থাকার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এত বড় একটি প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হলে একাধিক স্থানে একযোগে কাজ পরিচালনা করা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক জায়গায় স্বল্পসংখ্যক শ্রমিক দিয়ে ধীরগতিতে কাজ চালানো হচ্ছে।
এদিকে প্রকল্পের কাজ ঘিরে স্থানীয় একটি চক্রের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগও উঠেছে। পরে তৎকালীন পৌর প্রশাসক আবদুল বাতেন ওই চক্রকে প্রায় ৩ কোটি টাকায় ‘ম্যানেজ’ করেছেন-এমন গুঞ্জনও স্থানীয়ভাবে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে এমন ধীরগতির কারণে ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরাও ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কারণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে শুধু একটি প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয় না, ভবিষ্যতে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে পৌরসভার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির উদ্দীন প্রকল্পটির ধীরগতিতে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে ফেনী পৌরসভা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।" বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া এ কাজ সময়মতো শেষ করা না গেলে ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাংক ফেনী পৌরসভায় নতুন প্রকল্প দিতে আগ্রহী নাও হতে পারে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান (পিডিএলের) ডিপিএম শাহাদাত হোসেন বলেন, ইতিমধ্যে তারা কয়েকটি ড্রেনের কাজ শেষ করেছে। বাকি কাজও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করবেন।
ফেনী শহরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, সড়কের বেহাল দশা এবং ফুটপাত সংকট নিরসনে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রকল্পটি যেন সময়ক্ষেপণের কারণে ব্যর্থ না হয় এবং নিম্নমানের কাজের কারণে ভবিষ্যতে আবারও নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে না হয়—এখনই কঠোর নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন