প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা শূকরের একটি কিডনি ২৭১ দিন কার্যকর থাকার একটি নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মানুষের শরীরে জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের ঘটনা।
রোগী টিম অ্যান্ড্রুজের কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কারণে। ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি, ৬৬ বছর বয়সে তার শরীরে জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রতিস্থাপনের পরপরই কিডনিটি কার্যকর হতে শুরু করে এবং ২৭১ দিন ধরে রক্ত পরিশোধনের কাজ করে।
অ্যান্ড্রুজ বলেছেন, এই চিকিৎসা তাকে নতুন করে বাঁচার আশা দিয়েছে। কিডনিটি কার্যকর থাকার সময় তিনি কয়েক মাস হাসপাতালে গিয়ে ডায়ালাইসিস করাতে বাধ্য হননি। তিনি উল্লেখ করেন, ডায়ালাইসিস মেশিন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সম্ভাবনাই ছিল তার কাছে সবচেয়ে বড় আশা।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের চিকিৎসক দলের মতে, এই সাফল্য প্রমাণ করে যে মানুষের কিডনি পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের জন্য শূকরের অঙ্গকে ‘সেতু’ হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব রোগী মানবদাতার কিডনি পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন, তাদের জন্য এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে।
তবে ২৭১ দিন পর শূকরের কিডনিটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসকরা সেটি অপসারণ করেন এবং এরপর অ্যান্ড্রুজকে ৮২ দিন ডায়ালাইসিস নিতে হয়। পরে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি একজন মানবদাতার কিডনি পান। নতুন কিডনিটি ভালোভাবে কাজ করছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
অ্যান্ড্রুজকে জানানো হয়েছিল, মানবদাতার কিডনি পাওয়ার জন্য তাকে সাত বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। দীর্ঘ সময় ডায়ালাইসিসে থাকার বিষয়টি তার জন্য উদ্বেগের ছিল। তিনি বলেন, "সময় কমে আসায় পরিস্থিতি ক্রমেই হতাশাজনক হয়ে উঠছিল।" তাই শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগকে তিনি ‘আশা’ এবং ‘সুড়ঙ্গের শেষের আলো’ হিসেবে দেখেছিলেন।
অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য কিডনির সংকট দীর্ঘদিনের। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক লাখ মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন। অথচ প্রতি বছর সেখানে প্রায় ২৫ হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়। যুক্তরাজ্যেও সাত হাজারের বেশি মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের তালিকায় রয়েছেন।
অঙ্গের ঘাটতির কারণে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে অন্য প্রাণীর অঙ্গ মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন। গবেষকদের কাছে শূকরকে এ ধরনের চিকিৎসার জন্য উপযোগী প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ তাদের অঙ্গের আকার মানুষের অঙ্গের কাছাকাছি এবং শূকর পালনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
তবে সাধারণ শূকরের কিডনি মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করলে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সেটিকে বহিরাগত অঙ্গ হিসেবে শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে। এ কারণে গবেষকেরা জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত শূকর তৈরি করেছেন। অ্যান্ড্রুজের শরীরে প্রতিস্থাপন করা কিডনিটি একটি ইউকাটান মিনিয়েচার পিগ থেকে নেওয়া হয়েছিল, যার জিনে ৬৯টি পরিবর্তন করা হয়।
এসব জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে শূকরের কোষের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সহজে শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে। পাশাপাশি কিছু মানব জিন যুক্ত করা হয়েছে, যা শূকরের টিস্যুকে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা থেকে আড়াল করতে সহায়তা করে। শূকরের ডিএনএতে থাকা সম্ভাব্য ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
প্রতিস্থাপনের পর অ্যান্ড্রুজের কিডনিতে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার আক্রমণের প্রাথমিক কিছু লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। ওষুধের পরিবর্তনের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। তবে প্রায় ছয় মাস পর কিডনিটির রক্তনালিতে ক্ষতি ও প্রদাহ দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সেটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসকরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি ঠিক কী কারণে কিডনিটি ব্যর্থ হয়েছিল।
ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের চিকিৎসক ডা. লিওনার্দো রিয়েলা বলেন, "অঙ্গদাতার সংকট এখন একটি বড় সমস্যা। জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন এমন রোগীদের জন্য ভবিষ্যতে একটি বিকল্প হতে পারে, যাদের জীবিত মানবদাতা নেই এবং যারা দীর্ঘদিন ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল।"
চিকিৎসকরা বলছেন, অ্যান্ড্রুজের ঘটনা মানুষের শরীরে শূকরের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা যেমন দেখিয়েছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তথ্যসূত্র: বিবিসি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন