প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশে চরম তাপমাত্রার ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা হিট স্ট্রেসকে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তুলেছেন।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীতে জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ সেন্টার ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ সভায় এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোমিনুল ইসলাম। সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশ সেন্টারের ট্রাস্টি ড. এস এম মোর্শেদ।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক।
তিনি জানান, চরম তাপমাত্রা বর্তমানে মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও জীবিকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ৩৫ দিন দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের ঘটনা ঘটেছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ড. মল্লিক বলেন, বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু, দ্রুত নগরায়ণ, খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হওয়া, শীতল পরিবেশে প্রবেশের সীমিত সুযোগ এবং অনানুষ্ঠানিক বসতিতে মানুষের বসবাস—এসব কারণে চরম তাপের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, কৃষিশ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক ও হকাররা এ ঝুঁকিতে বেশি রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত তাপের কারণে হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ, শ্বাসকষ্ট ও পানিশূন্যতার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন পেশাগত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা, কুলিং সেন্টার স্থাপন, নগরে সবুজায়ন, ‘কুল রুফ’ ব্যবস্থা এবং তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন তিনি।
চরম তাপের অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরে ড. এস এম মোর্শেদ বলেন, বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাপজনিত উৎপাদনশীলতা কমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ১ দশমিক ৮ থেকে ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশের সমান।
ড. মোর্শেদ বলেন, তাপের কারণে উৎপাদনশীলতা কমার প্রভাব ঢাকায় সবচেয়ে বেশি।
ঢাকায় বছরে প্রায় ৩ শতাংশ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা ক্ষতির সঙ্গে তুলনীয়। ভবিষ্যতে এই ক্ষতি আরো বাড়তে পারে। ২০৮০ সালের মধ্যে ঢাকায় উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
তিনি আরো বলেন, তাপজনিত চাপ যথাযথভাবে মোকাবিলা করা না হলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া ২০৩০ সালের মধ্যে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হারাতে পারে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোমিনুল ইসলাম বলেন, চরম তাপের প্রভাব মোকাবিলায় খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনা জরুরি। কৃষি, পরিবহন, নির্মাণ ও পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে তাপজনিত ঝুঁকি আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য নির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
সভায় তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার পাশাপাশি তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। চরম তাপের ঝুঁকি চিহ্নিত করতে ঝুঁকি মানচিত্র প্রণয়ন, আবাসিক ভবনে তাপ কমানোর ব্যবস্থা এবং দুর্যোগের স্থায়ী আদেশাবলিতে হিট স্ট্রেসকে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের তালিকায় তাপ-সংশ্লিষ্ট কাজ অন্তর্ভুক্ত করা, তাপজনিত অসুস্থতাকে পেশাগত রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং কর্মস্থলে নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পানির পয়েন্ট স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পরামর্শ সভায় জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, শ্রমিক নেতা, গণমাধ্যমকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন