প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) প্রথমবারের মতো তামারং বেনেবউ পাখির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকর্মী অরিত্র সাত্তার পাহাড়ি বনাঞ্চলে বসবাসকারী এই তুলনামূলক বিরল পাখিটি দেখতে পান। পাখিবিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকার বাইরে এ প্রজাতির পাখির দেখা পাওয়া বেশ বিরল।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন এলাকায় একটি গাছে পাখিটি দেখা যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ পাখিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। সেখানে তামারং বা মেরুন বেনেবউয়ের উপস্থিতি ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্যের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে উন্মোচন করেছে।
মেরুন-কালো রঙের অনন্য পাখি
তামারং বা মেরুন বেনেবউয়ের ইংরেজি নাম Maroon Oriole এবং বৈজ্ঞানিক নাম Oriolus traillii। পাখিটির দেহের গাঢ় তামাটে বা মেরুন রং এবং কালো মাথার কারণে এটি সহজেই অন্য বেনেবউ প্রজাতি থেকে আলাদা করা যায়। আকারে এটি ময়নার চেয়ে সামান্য বড়। সাধারণত গাছের উঁচু ডালে ও পাতার আড়ালে অবস্থান করে, তাই পাখিটিকে সহজে চোখে পড়ে না।
প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ পাখির দেহের অধিকাংশ পালক চকচকে গাঢ় তামাটে-মেরুন রঙের। মাথা, ঘাড় ও ডানা কালো। ঠোঁটের রং নীলাভ কালো এবং লেজের দিকে তামাটে-বাদামি আভা থাকে। অন্যদিকে, স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ পাখির দেহের নিচের অংশ ধূসর-সাদা, যার ওপর কালো দাগ দেখা যায়। পাখিটি সাধারণত একা বা জোড়ায় বিচরণ করে। কখনো কখনো ফিঙে কিংবা মিনিভেটের মতো পাখির দলের সঙ্গেও দেখা যায়। উঁচু গাছের পাতা ও ডালপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকলেও ফুলের মধু সংগ্রহের সময় তুলনামূলকভাবে সহজে চোখে পড়ে। এর ডাক কিছুটা কর্কশ ‘কিহ-আ’ শব্দের পর শিসের মতো ‘পি-লো-লো’ ধ্বনির সমন্বয়ে তৈরি।
পাহাড়ি বনই প্রধান আবাসস্থল
তামারং বেনেবউ মূলত হিমালয়ের পাদদেশের আর্দ্র পর্ণমোচী ও চিরসবুজ বন এবং সংলগ্ন সমতল এলাকার পাখি। ভারতীয় উপমহাদেশে হিমাচল প্রদেশ থেকে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত হিমালয়সংলগ্ন অঞ্চলে এবং দক্ষিণে মণিপুরসহ আশপাশের এলাকায় এর বিস্তৃতি রয়েছে। বাংলাদেশে সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চলে পাখিটি দেখা যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও পাখিবিশেষজ্ঞ ড. এম মনিরুল এইচ খান বলেন, তাম্ররঙা বেনেবউ মূলত সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় দেখা যায়। তবে সেখানেও পাখিটি খুব একটা সচরাচর দেখা যায় না।
তিনি বলেন, ‘শহর বা শহরতলির বনাঞ্চলে এ প্রজাতির পাখি দেখা যাওয়া একেবারেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়।’
মনিরুল এইচ খান আরো বলেন, পাহাড়ি এলাকার বাইরে বাংলাদেশে এর আগে মাত্র দুবার পাখিটির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে একবার ঢাকার মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে এবং অন্যবার দিনাজপুরের উত্তর নবাবগঞ্জে পাখিটির দেখা মিলেছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসের আশপাশের অনেক এলাকায় একসময় প্রচুর গাছপালা ছিল। তবে সেসব গাছপালার বড় একটি অংশ এখন আর নেই। তুলনামূলকভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এখনো পাখির জন্য ভালো আবাসস্থল।
কী খায়, কোথায় বাসা বাঁধে
তামারং বেনেবউয়ের খাদ্যতালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ, শুঁয়োপোকা, অন্যান্য ক্ষুদ্র অমেরুদণ্ডী প্রাণী, জামজাতীয় ফল, বুনো ডুমুর, বেরি ও ফুলের মধু। গাছের পাতা ও ডালে ডালে খাবারের সন্ধান করে, তাই এর খাদ্য সংগ্রহের বড় অংশই বৃক্ষনির্ভর।
প্রজনন মৌসুমে সাধারণত এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে এ পাখিকে বাসা তৈরি করতে দেখা যায়। গাছের ডালের দুই প্রান্তের সংযোগস্থলে তন্তু ও মাকড়সার জাল দিয়ে কাপের মতো বাসা তৈরি করে। এতে সাধারণত দুই থেকে তিনটি গোলাপি-সাদা ডিম পাড়ে, যেগুলোর গায়ে কালো বা লালচে-বাদামি দাগ থাকে। বাংলাদেশে এ প্রজাতির পাখির উপস্থিতি দেশের বনাঞ্চল ও বৃক্ষনির্ভর জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রাকৃতিক বন, বড় গাছ এবং ঘন বৃক্ষরাজি টিকে থাকলে এ ধরনের পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণে সহায়ক পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব।
প্রকৃতি সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনা
ক্যাম্পাসে তামারং বেনেবউয়ের উপস্থিতি সম্পর্কে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকর্মী ও তরুণ গবেষক অরিত্র সত্তার বলেন, পাখিটির দেখা পাওয়া প্রমাণ করে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের পরিবেশ গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষের আগের কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রাকৃতিক আবাসস্থল আরো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এ জন্য সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরিবেশকে মানুষের বিরক্তি ও হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাখির আবাসস্থল রক্ষায় গাছপালা সংরক্ষণ, নির্বিচার বৃক্ষনিধন রোধ এবং পাখির বিচরণস্থলে অপ্রয়োজনীয় মানুষের হস্তক্ষেপ কমানো গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখা গেলে বিরল ও অনিয়মিতভাবে দেখা দেওয়া পাখির জন্যও অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকতে পারে।
এদিকে, পাখিবিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, চলতি বছর পরিযায়ী পাখিরা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আসতে শুরু করেছে। আগের বছরগুলোতে কিছু প্রজাতির পাখির আগমনে বিলম্ব দেখা গেলেও এবার তাদের আগমন সময়মতো হচ্ছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তামারং বেনেবউয়ের উপস্থিতি তাই শুধুমাত্র একটি বিরল পাখি দেখার ঘটনা নয়; বরং ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক পরিবেশ, বৃক্ষরাজি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরার একটি উপলক্ষ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন