প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিসির অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে প্রায় শতবর্ষী চারটি যাত্রীবাহী প্যাডেল নৌযান ধ্বংসের সীমানায় পৌঁছেছে। বর্তমানে চারটি জাহাজের মধ্যে কেবল ‘পিএস মাহসুদ’ ইজারাদারের অধীনে রয়েছে, কিন্তু বাকি তিনটির বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সংস্থাটি। এই কারণে এগুলোর অস্তিত্ব এখন বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। সারাবিশ্বে এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী নৌযানের সংখ্যা খুবই কম, যার মধ্যে চারটি বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত।
ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, দেশভাগের সময় ব্রিটিশ ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত আইজিএন ও আরএসএন কোম্পানির কলকাতার গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্সে অন্তত ২৫টি বাষ্পীয় প্যাডেল জাহাজ নির্মিত হয়েছিল, যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আওতাধীন ছিল। বিভিন্ন সময়ে বিক্রি ও হ্রাসের পর পিএস গাজী, পিএস কিউই, পিএস অস্ট্রিচ, পিএস মাহসুদ, পিএস লেপচা ও পিএস টার্ন অবশিষ্ট ছিল। ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় পিএস মাহসুদ, পিএস অস্ট্রিচ ও পিএস লেপচায় আধুনিকায়ন শুরু হয়েছিল, যেখানে মেরিন ডিজেল ইঞ্জিন সংযোজন করা হয়। ১৯৮২ সালে যাত্রী পরিবহনে যুক্ত হওয়ার পর হাইড্রোলিক গিয়ারে ত্রুটির কারণে মাত্র তিন হাজার ঘণ্টা চলার পর এগুলো স্থায়ীভাবে বিকল হয়ে যায়।
দীর্ঘ সময় ফেলে রাখার পর ১৯৯৩ সালে মেকানিক্যাল গিয়ার সংযোজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত নৌযানগুলো ঢাকা-বরিশাল-খুলনা রুটে লক্ষাধিক যাত্রী পরিবহন করেছে। ২০০২ সালে নিজস্ব অর্থে পিএস টার্ন জাহাজটিতে নতুন ইঞ্জিন সংযোজন করা হয়। তবে বিআইডব্লিউটিসির রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের কারণে ২০১৯ সালের দিকে নৌযানগুলো আবারও ক্রমান্বয়ে বিকল হয়ে পড়ে। করোনা মহামারী শুরু হলে যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়।
গত বছর নৌযানগুলো পুনরায় মেরামত ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে পিএস মাহসুদ মেরামত করে ঢাকা-বরিশাল রুটে চালুর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু পরে তা দিবাকালীন ‘পর্যটক সার্ভিস’ হিসেবে রূপান্তর করা হয়। প্রথম শ্রেণীতে ২৬০০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণীতে ১৬৫০ টাকা এবং ডেক শ্রেণীতে ৬০০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে গত বছর ২৮ নভেম্বর মাত্র ৩২ জন যাত্রী নিয়ে জাহাজটি ঢাকা ত্যাগ করে। এরপর নামমাত্র কয়েকটি ট্রিপ পরিচালনার পর সেটিকে ইজারাদারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে ক্রুদের বেতন বাদে মাসিক দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে একটি প্রতিষ্ঠান পিএস মাহসুদ দিয়ে ঢাকা ও আশপাশে পর্যটক সার্ভিস পরিচালনা করছে।
বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক-বাণিজ্য মো. আশিকুজ্জামান জানান, অবশিষ্ট তিনটি নৌযানও শিগগিরই ইজারা দেওয়ার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে নৌপরিবহন মন্ত্রীর ইচ্ছায় বেআইনি ও বিনা দরপত্রে ‘পিএস অস্ট্রিচ’ একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছিল। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ইজারাদার ওই জাহাজের ওপরিকাঠামোর বেশিরভাগ অংশ ভেঙে ফেলেছে এবং নির্ধারিত ভাড়াও পরিশোধ করেনি। দীর্ঘদিন আটকা থাকার পর সম্প্রতি ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ নিয়ে জাহাজটি উদ্ধার করা হয়। বকেয়া আদায়ের মামলা চলমান থাকলেও সেই বিধ্বস্ত জাহাজটিও পুনরায় ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।
অথচ গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার সামনে ঘোষণা করেছিলেন যে, পিএস অস্ট্রিচসহ সব প্যাডেল নৌযান ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। কিন্তু বর্তমান সরকারের সাড়ে আট মাসেও এই বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষায় কোনো ইতিবাচক বা কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে পরিচালক-বাণিজ্য আশিকুজ্জামান দাবি করেছেন, মাহসুদ ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং বাকিগুলোও ইজারা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন