প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একটি মুদ্রা হাতে নিলে তার নকশা, লেখা কিংবা ধাতব গড়ন চোখে পড়ে। তবে, সেই মুদ্রার গায়েই লুকিয়ে থাকতে পারে কোনো শাসকের পরিচয়, হারিয়ে যাওয়া জনপদের ইতিহাস অথবা কয়েক হাজার বছর আগে মানুষের জীবনযাত্রার গল্প। কিছু মুদ্রা এসেছে প্রাচীন রাজ্য থেকে, কিছু সুলতানি বা মোগল আমলের স্মৃতি বহন করছে। আবার কিছু মুদ্রা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর চালু হওয়া টাকার বিরল নমুনা। রাজধানীতে মুদ্রার এমন বিচিত্র সংগ্রহ নিয়ে শুরু হয়েছে তিন দিনের ষষ্ঠ বিএনসিএস মুদ্রা প্রদর্শনী-২০২৬।
ধানমণ্ডির মাইডাস সেন্টারে গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ নিউমিসম্যাটিক কালেক্টরস সোসাইটির (বিএনসিএস) আয়োজনে এই প্রদর্শনী শুরু হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৪৩ জন নবীন ও প্রবীণ মুদ্রা সংগ্রাহক তাঁদের সংগ্রহের ৬১টি বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শনী উপস্থাপন করছেন। প্রদর্শনী চলবে আগামীকাল শনিবার পর্যন্ত।
প্রদর্শনীর বিশেষত্ব হলো, এখানে মুদ্রাকে শুধু লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থব্যবস্থার বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রাচীন জনপদ থেকে আধুনিক
বাংলাদেশ : প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে লিডিয়ায় প্রচলিত বিশ্বের প্রাচীনতম মুদ্রাগুলোর অন্যতম নিদর্শন থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন মুদ্রা। গান্ধার, মগধ, বঙ্গ ও সমতটের মতো প্রাচীন জনপদ এবং মৌর্য, কুষাণ ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের মুদ্রার পাশাপাশি রয়েছে দিল্লি ও বাংলার সুলতানি শাসন, মোগল এবং ব্রিটিশ আমলের মুদ্রা।
এ ছাড়া পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের মুদ্রাও প্রদর্শিত হচ্ছে। এসব মুদ্রার নকশা, শাসকের নাম, উপাধি ও অন্যান্য চিহ্নের মধ্য দিয়ে অতীতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের মুদ্রার সংগ্রহেও রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। ১৯৭২ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন মূল্যমানের ব্যাংকনোটের নকশা, নমুনা নোট, প্রথম ও শেষ সিরিয়ালের নোট, ত্রুটিপূর্ণ নোট এবং ৫০০ টাকার ব্যাংকনোটের বিভিন্ন প্রিফিক্সের নমুনা স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে।
এক টাকার নোট থেকে দুর্লভ
ব্যাংকনোট : ব্যাংকনোটের সংগ্রহে রয়েছে ১৯১৭ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলে ব্যবহৃত এক টাকার নোটের ধারাবাহিক ইস্যু। এর পাশাপাশি বিলুপ্ত দেশ ও বিভিন্ন দেশের ঔপনিবেশিক আমলের নোট, মসজিদের ছবি ও ক্যালিগ্রাফিযুক্ত ব্যাংকনোট, রেলপথ ও উড়োজাহাজের ছবি সংবলিত নোট এবং বিভিন্ন দেশের পলিমার নোটও প্রদর্শিত হচ্ছে।
মুদ্রার গড়নেই বিস্ময় : ধাতব মুদ্রার সংগ্রহেও রয়েছে ব্যতিক্রমী সব নিদর্শন। সোনারগাঁ থেকে সুলতানি আমলে ইস্যু করা মুদ্রা, বাংলার সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদের বিভিন্ন নকশার মুদ্রা এবং ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস-সম্পর্কিত মুদ্রা প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন শাসক ও সাম্রাজ্যের এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বর্ণমুদ্রা। কোনো মুদ্রা ছিদ্রযুক্ত, কোনোটি দ্বিধাতব, আবার কোনোটি রঙিন কিংবা অস্বাভাবিক আকৃতির। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের বিভিন্ন দেশীয় মুদ্রা এবং বাংলার সুলতানি মুদ্রার অলংকরণও সংগ্রাহকদের আগ্রহ বাড়াবে।
প্রদর্শনীর বিস্ময় শুধু প্রচলিত মুদ্রায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বৃহত্তম ও দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংকনোটের পাশাপাশি ক্ষুদ্রতম নোটও রয়েছে এখানে। আরো আছে দাস কেনাবেচায় ব্যবহৃত ব্রেসলেট মুদ্রা, চা-পাতা দিয়ে তৈরি বড় আকারের মুদ্রা, আফ্রিকার বিখ্যাত কাটাঙ্গা ক্রস, ছুরির মতো আকৃতির প্রাচীন চীনা মুদ্রা, বুলেট মুদ্রা, বোটমানি, বাঘের জিহ্বা মুদ্রা এবং লাইবেরিয়ার কিসি পেনি। ২৪ ক্যারেট স্বর্ণে তৈরি ব্যাংকনোটও রয়েছে ব্যতিক্রমী সংগ্রহে।
বিনিময় থেকে মুদ্রা, বদলেছে অর্থের ইতিহাস : প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে যমুনা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মির্জা ইলিয়াস উদ্দিন আহম্মদ মুদ্রার বিবর্তনের ইতিহাস তুলে ধরেন। মির্জা ইলিয়াস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, মুদ্রার মূল্য নির্ধারণে শুধু এর ধাতব উপাদান বা ওজনই বিবেচ্য নয়। এর বিরলতা, ঐতিহাসিক গুরুত্ব, নকশা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও সংগ্রাহকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একটি পুরনো মুদ্রা মানুষের মধ্যে অতীত সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি করে এবং সংগ্রাহকদের নিজেদের সংগ্রহ অন্যদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ দেয়।
সংগ্রহের পাশাপাশি গবেষণার উদ্যোগ : উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এ কে এম সারোয়ার জাহান জামিল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনসিএসের সভাপতি মো. রবিউল ইসলাম।
এদিন প্রথমবারের মতো প্রকাশ করা হয় মুদ্রাবিষয়ক গবেষণাধর্মী সাময়িকী ‘বিএনসিএস জার্নাল’। এর মাধ্যমে মুদ্রা সংগ্রহের পাশাপাশি এ বিষয়ে গবেষণা ও জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।
মুদ্রা সংগ্রহের শখকে জনপ্রিয় করা এবং নতুন সংগ্রাহক তৈরি করার লক্ষ্যে ২০০৮ সাল থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিএনসিএস। প্রদর্শনীতে মুদ্রা সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যালবাম, প্রটেক্টরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার সুবিধার্থে রাখা হয়েছে দুটি বিক্রয় বুথও।
দর্শনার্থীরা বলছেন, এই প্রদর্শনীতে একেকটি মুদ্রা যেন একেকটি সময়ের প্রতিনিধি। কোনোটি প্রাচীন রাজ্যের স্মৃতি বহন করছে, কোনোটি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সাক্ষ্য দিচ্ছে, আবার কোনোটি আধুনিক অর্থব্যবস্থার বিবর্তন তুলে ধরছে। মুদ্রার গায়ে খোদাই করা নাম, সাল ও নকশার সূত্র ধরে দর্শনার্থীরা তাই শুধু দুর্লভ সংগ্রহ দেখার সুযোগই পাচ্ছেন না; পাচ্ছেন ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন