প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পর্যটন নগরী কুয়াকাটার সার্বিক ও পরিকল্পিত উন্নয়নের লক্ষ্যে গৃহীত মাস্টারপ্ল্যানের প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে রয়েছে। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক মানের পরিকল্পিত পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এক দশকেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
মাস্টারপ্ল্যানের এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে কুয়াকাটায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন ও হোটেল-মোটেল। অন্যদিকে, সৈকত ও দর্শনীয় স্থানগুলো অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে যাচ্ছে। এর ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারানোর পাশাপাশি পরিবেশের ওপর চাপ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নতুন বিনিয়োগে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে বিশ্বমানের পর্যটন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত নগরায়ণ ও দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবে ব্যবস্থাপনাগত সংকট ক্রমাগত বাড়ছে। বিচের পাড়সহ দর্শনীয় বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধ দখলদারদের কার্যক্রম ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক সাইমুন ইসলাম মন্তব্য করেন, ‘কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত ব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধার আরও উন্নয়ন প্রয়োজন। সড়ক, পর্যটন স্পট এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দ্রুত গড়ে তোলা দরকার।’
মাদারীপুর থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক শায়লা আক্তার তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, ‘পরিবার নিয়ে বেড়াতে এলে যাতায়াত, নিরাপদ পরিবেশ ও মানসম্মত আবাসনের সংকট চোখে পড়ে। কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আকর্ষণীয় হলেও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা অপ্রতুল। এখানে পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারতেন।’
এদিকে, মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে স্থানীয় ও বহিরাগত বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, জমি কেনাবেচা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে প্রশাসনিক অনুমতি নেয়ার বিধান থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতায় প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন আটকে থাকে। বিশেষ করে জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের অনুমতি পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, যা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কুয়াকাটা প্রেসিডেন্ট পার্ক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের মালিক মো. কাজী ফারুক এ বিষয়ে বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যানের এই অনিশ্চয়তা কুয়াকাটার পর্যটন খাতের উন্নয়ন ও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা। জমি কেনাবেচা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া সম্ভব হয় না। দ্রুত মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করে ভূমির ব্যবহার, ভবন নির্মাণ ও অবকাঠামোগত নির্দেশিকা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এটি করা গেলে বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা কমবে এবং একটি পরিকল্পিত পর্যটন নগরী গড়ে উঠবে।’
পর্যটন খাতের বর্তমান চিত্র নিয়ে সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলাসের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আনোয়ারুল আজিম বলেন, “কুয়াকাটার পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা অফুরন্ত। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পরিকল্পিত অবকাঠামো, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কুয়াকাটার টেকসই উন্নয়নে ‘কুয়াকাটা টুরিজম সেন্টার’ (কেটিসি) গড়ে তোলার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটি কেবল কাগজে-কলমেই থেকে গেছে। ফলে বাস্তবমুখী উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।”
কুয়াকাটায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রশাসনিক স্থবিরতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘কুয়াকাটার আসল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রথমেই অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ করতে হবে এবং সমন্বিত উন্নয়নের রূপরেখা বাস্তবায়নে নামতে হবে। মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে কোথায় কী ধরনের স্থাপনা হবে, পরিবেশের সুরক্ষা কীভাবে হবে এবং পর্যটকদের অবকাঠামোগত সুবিধা কী থাকবে। সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যাগুলো সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।’
সার্বিক বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ জানান, কুয়াকাটার পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে মাস্টারপ্ল্যান সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হবে। পর্যটন কেন্দ্রটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ভূমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন