প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে সংসদে থাকা প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির দ্রুত সংসদ থেকে ভিন্ন পথে গাড়ি বহর নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া কি বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা এবং নেপালের জেন-জি তথা নতুন জেনারেশনের আন্দোলনের তীব্রতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে?
শ্রীলঙ্কার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাসীন সরকারের নাটকীয় বিদায়, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা এক নায়ক ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং নেপালে ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকারের পতন—দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। সেই বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে জেন-জি প্রজন্ম, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সাংগঠনিক শক্তি এবং রাজপথের আন্দোলনকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সাম্প্রতিক ককরোচ জনতা পার্টি নামে জেন-জিদের ছাত্র আন্দোলন অনেকের মনেই অনুরূপ অনেক নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ঘিরে ভারত সরকারের দুর্নীতির অভিযোগ, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্টদের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত দিল্লির যন্ত্র মন্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
আন্দোলনের উত্তাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনও তা উপেক্ষা করতে পারেনি। আন্দোলনকারীদের স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নয়াদিল্লি। আন্দোলন সংসদ অভিমুখে অগ্রসর হলে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও কঠোর হয়, নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে সংঘর্ষের পর একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জেন-জি ও ছাত্র-জনতা সংসদ ভবনের দিকে ঢুকে পড়তে চেষ্টা করে। এসব দৃশ্য অনেকের কাছেই দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।
ককরোচ জনতা পার্টির আহবানের ছাত্র জনতার যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়া এবং এই উত্তাল বিক্ষোভ মোদি সরকারের সংসদ অভিমুখে ঢুকে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংসদ থেকে দৌড়ে পেছন দরজা দিয়ে গাড়িবহরে করে পালিয়ে গেলেও অবশ্য এই আন্দোলনের ফলে মোদি সরকারের এখনও পতন ঘটেনি। কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে হয়তো সরকারের ভিতর ভয় ও আতঙ্ক ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে—যদি এই আন্দোলনের তীব্রতা আরও বাড়ে, যদি তা দিল্লি ছাড়িয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে একইভাবে বিস্তার লাভ করে, তবে রাজনৈতিক সমীকরণ কি অপরিবর্তিত থাকবে?
কারণ দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অসন্তোষ জমা হচ্ছে। মণিপুরসহ সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলের অস্থিরতা, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে ধারাবাহিক বিক্ষোভ, বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন দিয়ে রাষ্ট্রের বিশাল এক জন গোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার হরণ করা, ৩০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে মসজিদ ভেঙে মন্দির নির্মাণ এবং কেন্দ্রের কঠোর নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ের কেন্দ্রীভূত ক্ষোভ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি মোটেও মোদি সরকারের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। সমালোচকদের অভিযোগ, গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের অতিরিক্ত প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এছাড়া নাগরিকত্ব আইন, ভোটাধিকার, সংখ্যালঘু মুসলিম ও দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার, কাশ্মীর প্রশ্ন, ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে বিরোধ এবং বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ—এসব বিষয়ও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব নীতির কারণে ভারতের একটি বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ জমেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিতে পারে।
একই সঙ্গে বিরোধীদের একটি অংশ অভিযোগ করে আসছে যে, প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে মোদি সরকার সীমান্তে একটি নাটক সৃষ্টি করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে পাকিস্তানের সাথে কিংবা প্রতিবেশীর রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধভাব তৈরি করে নিজেকে দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদীদের একমাত্র ধারক বাহক হিসেবে উপস্থাপন করে জনগণের সামনে সেই আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে নির্বাচনে জেতার কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়। এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।
বিশেষ সাম্প্রতিক সময়ে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রতিটি নির্বাচনের পূর্বে যেমন উড়ি, পুলওয়ামা ও সর্বশেষ পহেলগাম নিয়ে পাকিস্তানের সাথে সর্বশেষ অপারেশন সিন্দুর নামে সীমান্ত যুদ্ধ মূলতো এগুলো জনগণকে বোঝানো যে মোদি সরকার দেশপ্রেমিক । এটি নাটক হিসেবে মোদি সরকারের সাজানো যুদ্ধ কিনা সেটি এখন সবচেয়ে বড় সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থক মুসলিম ও দলিত সম্প্রদায়ের প্রায় ৯০ লক্ষাধিক ভোটাধিকার হরণ করে ভোটার বিহীন একতরফা বিজেপি সমোচিত ভোটার দিয়ে নির্বাচন করে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোটে হারিয়ে দিয়ে যে ক্ষোভের উদগীরণ মমতার ভিতর জ্বালিয়ে দিয়েছে, তামিলনাড়ুতে নতুন কিংস্টার মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয় কিংবা অন্যান্য রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ছাত্র-জনতার এই অসন্তোষকে বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ দিতে সক্ষম হয়, তাহলে কি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন এক মোড় নেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎই দেবে। তবে এটুকু বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে জেন-জি প্রজন্ম ইতোমধ্যেই নিজেদের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সেই বাস্তবতার ঢেউ যদি সত্যিই গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সামনে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা অপেক্ষা করছে এবং মোদি সরকারের পতন হলেও অবাক হবার কিছুই থাকবে না। সেই পরিস্থিতির পরিণতি কী হবে—তা সময়ই নির্ধারণ করবে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস বিবেচনায় নিয়ে এমন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করাকে একেবারে অমূলক বলাও কঠিন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন