প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নারায়ণ প্রসান সৌদি আরবে পাঁচ বছর কাজ করার পর জমানো অর্থ নিয়ে নেপালে ফিরে এসেছিলেন। সেই অর্থ দিয়ে তিনি নিজের বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে তার বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তীতে বিদেশে গিয়ে আবারও কাজ করে তিনি বাড়িটি পুনর্নির্মাণ করেন।
পরিবারের সঙ্গে নতুন করে স্বাভাবিক জীবন শুরু করেছিলেন প্রসান। কিন্তু গত মাসের ভয়াবহ বন্যা তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। বন্যায় তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বর্তমানে তিনি এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তার বাড়িটি অবস্থিত হওয়ায় সেখানে পুনরায় বসবাস করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরিবারকে কোথায় পুনর্বাসন করা হবে, সে বিষয়েও এখনও কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে সংসার চালাতে আবারও বিদেশে গিয়ে কাজ করার চিন্তা করছেন তিনি। প্রসান বলেন, "এই বন্যা সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমি জানি না এখন কী করব।"
নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার এক মাস পরেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। প্রসানের মতো হাজার হাজার মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। একই সঙ্গে নিখোঁজ আরো হাজার হাজার মানুষের সন্ধান চলছে। নিখোঁজদের মধ্যে অনেকেই ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ভয়াবহ দুর্যোগের পর নেপাল সরকারকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রিয়জন হারানোর পাশাপাশি বাড়িঘর ও জীবিকা হারানোর কষ্টও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণে দেশটির সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে এবং নেপালের এই দুর্যোগ পুরো বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
শাহ বলেন, "এই দুর্যোগ শুধু একটি স্থানীয় বিপর্যয় নয়, বরং বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা কি সত্যিই সেই সতর্কবার্তা শুনেছি?"
তিনি নেপালের পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। শাহ বলেন, "জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সীমানা চেনে না। হিমবাহ ও বন্যা স্ট্যাম্প বা পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করে না।"
ডিএনএ পরীক্ষায় বিলম্বিত হচ্ছে মরদেহ হস্তান্তর। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, বন্যা ও ভূমিধসের পর এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৫৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ৬৪৪ জন। উদ্ধার করা মরদেহগুলোর মধ্যে মাত্র ১১২টি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় আরো ১ হাজার ৩৩২টি মরদেহ সাময়িকভাবে সমাহিত করা হয়েছে।
প্রতিবেশী চীনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। মরদেহ শনাক্ত করতে কাঠমান্ডুর নেপাল পুলিশ হাসপাতালে একটি অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে স্বজনদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে এসব নমুনা উদ্ধার করা মরদেহ ও দেহাবশেষ থেকে সংগৃহীত ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ।
ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার পরই মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। ফলে অনেক পরিবারকে প্রিয়জনের মরদেহ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গোপনীয়তার কারণে পরীক্ষাগারের কর্মকর্তারা বিস্তারিত তথ্য দিতে চাননি। তবে তারা জানিয়েছেন, মরদেহ শনাক্তের কাজে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী রবি কুমার থাপা মাগার বন্যায় তার স্ত্রী, ভাই, ভাবি ও মাকে হারিয়েছেন।
তিনি জানান, একটি ছবি দেখে তিনি তাঁর স্ত্রীর মরদেহ শনাক্ত করেছিলেন। কিন্তু পরিবারের কেউ মরদেহ দেখার আগেই সেটি দাফন করে ফেলা হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ স্বজনদের দেওয়া হবে না। এই পরীক্ষা শেষ হতে অন্তত এক মাস সময় লাগতে পারে। পরে পরিবারটি একটি প্রতিমূর্তি দিয়ে প্রতীকীভাবে শেষকৃত্য সম্পন্ন করে। বন্যায় সন্তান হারানো অনেক পরিবার এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।
৩২ বছর বয়সী পাসং মায়া তামাং বন্যায় তার ছোট ছেলেকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, এখনো স্বপ্নে ছেলেকে দেখতে পান। স্বপ্নে ছেলে যেন তাঁকে সাহায্যের জন্য ডাকছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নুয়াকোটের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে তামাং বলেন, "আমার ছেলের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু আমি তাকে শেষবার দেখতে পারিনি। এ জন্য আমার খুব কষ্ট হয়। স্বপ্নে শুনি, সে বলছে—কেন আমি তাকে একা রেখে চলে গেলাম?"
বন্যার সময় তার ছেলে এক প্রতিবেশীর সঙ্গে স্কুলে গিয়েছিল। পরে খবর পাওয়ার আগেই স্কুলটি পানিতে ভেসে যায়। তিন দিন পর দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলা থেকে তার ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু তিনি সেখানে গিয়ে ছেলের মরদেহ দেখতে পারেননি।
গত ২৬ আগস্ট সকালে ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে নেপালে। তখন অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে পৌঁছাচ্ছিল বা স্কুলের পথে ছিল। এতে অনেক শিশুও বন্যার পানিতে ভেসে যায়। নুয়াকোটের বাসিন্দা আস্তা মান ডাঙ্গোল বলেন, পরে কয়েকজন শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের কারও কারও গায়ে তখনও স্কুলের লোগোযুক্ত টাই ছিল।
তিনি বলেন, "বড় শিক্ষার্থীরা দৌড়ে উঁচু জায়গায় উঠে যেতে পেরেছিল। কিন্তু ছোট শিশুরা দ্রুত দৌড়াতে পারেনি। তারা পানিতে ভেসে যায়।" এদিকে, বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ আবার চালু করতে কাজ করছেন কর্মীরা।
নেপাল সরকারের হিসাবে, বন্যার পর পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে প্রায় ৪৭৭ কোটি ডলার খরচ হতে পারে। এতে প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বাড়িঘর।
বর্তমানে উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও সেতু মেরামত করে যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সেখানে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সড়ক প্রকৌশলী ইশমিতা শাহ জানান, বন্যার দ্বিতীয় দিন থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রাস্তা চালু করতে নেপালের সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করছেন তারা। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে নতুন সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। তবে আগামী কয়েক দিনে আরও খারাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় পুনরুদ্ধারের কাজ কঠিন হতে পারে বলে জানান তিনি।
ইশমিতা শাহ বলেন, "আবহাওয়ার কারণে আগামী কয়েক দিন কঠিন হতে পারে। তবে আমরা এর জন্য প্রস্তুত আছি।"
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন