===========================
প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট না হওয়া এবং সন্দেহ আর অবিশ্বাসের মধ্যে তৈরি হওয়া এই মক্কা জোট ইতিমধ্যে তার কিছুটা পরিচয় প্রকাশ করেছে। কারণ ইতিমধ্যে ইরানপন্থী ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্যে মক্কা জোটের সদস্য পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, সৌদি আরবের কোন স্বার্থে হামলা করলে তাদের দুই দেশীয় প্রতিরক্ষা জোট কিংবা ত্রিদেশীয় মক্কা জোট সক্রিয় হবে এবং প্রয়োজনে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে। এবার তাহলে প্রশ্ন, এই মক্কা'র নামে মুসলিম'দের নামে কিংবা ইসলামের নামে তৈরি জোট আসলে কি ইজরাইল-আমেরিকা বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে, নাকি অপর মুসলিম রাষ্ট্রের ভাইদের ধ্বংস করার জন্য আমেরিকা ইসরাইলের দালাল বা প্রক্সি গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি পাবে?
মুসলমানের বিরুদ্ধে মুসলমানের অস্ত্র—আর সেই অস্ত্রের পেছনে যদি থাকে আমেরিকান সামরিক ছায়া ও ইসরাইলি স্বার্থ, তাহলে সেই যুদ্ধকে মুসলিম বিশ্বের প্রতিরক্ষা বলা হবে কীভাবে? প্রশ্নটি সরাসরি অস্বস্তিকরও বটে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার আর সুযোগ নেই।
মুসলিম বিশ্বের নামে যদি কোনো জোট তৈরি হয়, মক্কার পবিত্র নাম যদি সেই জোটের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্র যদি তাতে যুক্ত হয়, তুরস্ক যদি তার অংশ হয় এবং সৌদি আরব যদি তার নেতৃত্বে থাকে—তাহলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত: এই জোটের শত্রু কে?
ইসরাইল?
আমেরিকা?
নাকি ইরান?
আর যদি উত্তর হয়—ইরান ও ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধশক্তি—তাহলে আরও বড় প্রশ্ন সামনে আসে:মুসলিমদের নিরাপত্তার নামে গঠিত জোট কি শেষ পর্যন্ত মুসলিমদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করবে?
এই প্রশ্নই আজ মক্কা জোটের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক, নৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রশ্ন।
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ, আর মুসলিম বিশ্বের বিভক্তি
===============================
ইরানের ওপর ইহুদিবাদী ইসরাইল ও তার প্রধান মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ছয় মাস অতিক্রম করেছে—এমন দাবি ও বর্ণনা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। এই সংঘাতের মধ্যেই আক্রমণকারী শক্তির সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশ্ন উঠছে আমেরিকার সামরিক শক্তির ক্ষয় ও ধ্বংস নিয়েও এবং ইরান তার প্রতিরোধক্ষমতা প্রদর্শন করছে এবং এমন প্রতিরোধ তৈরি করেছে যার ফলে ইহুদীবাদী ইজরাইল ও মার্কিন শক্তি মধ্যপ্রাচ্যে কোনঠাসা হয়ে যুদ্ধ থেকে পালানোর পথ খুঁজছে।
কিন্তু এই যুদ্ধকে কেবল ইরান-ইসরাইল বা ইরান -আমেরিকার সংঘাত হিসেবে দেখলে মধ্যপ্রাচ্যের আসল চিত্রটি ধরা পড়বে না। কারণ গত কয়েক দশকের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়—জায়ানবাটি তথা ইহুদীবাদী ইসরাইল ও মুসলিম বিরোধী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি সম্মিলিতভাবে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, আফগানিস্তান, লেবানন এবং ফিলিস্তিনে যুদ্ধ করে সে সেই রাষ্ট্রগুলোকে ইতিমধ্যে ধ্বংস করেছে কোন কারণ ছাড়াই, এসব মুসলিম রাষ্ট্রে আগ্রাসন, ধ্বংস ও প্রাণহানির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এসব সংঘাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর পড়েছে। যাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে আরব রাষ্ট্রগুলো। অর্থাৎ অপর মুসলিম দেশ ধ্বংসকারী ইহুদিবাদী ইজরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ শক্তি হয়েছে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহারাইন, আরব আমিরাত জর্ডান ও অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলো।
প্রশ্ন হলো—এই দীর্ঘ ধ্বংসযজ্ঞের সময় মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো কোথায় ছিল?
কেন মুসলিম রাষ্ট্রগুলো একে একে ধ্বংসের মুখে পড়ল? কেন তাদের প্রতিরোধে একটি কার্যকর মুসলিম সামরিক ঐক্য গড়ে উঠল না? আর কেন আজ, যখন ইরান পশ্চিমা ও ইসরাইলি শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে বলে তার সমর্থকেরা দাবি করছে, তখন মুসলিম বিশ্বের একাংশ ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে? মুসলিম পরিচয়, কিন্তু কার সঙ্গে সামরিক জোট?
সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। এসব রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিও রয়েছে।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনে ইসরাইলের সামরিক অভিযান, গাজায় বিপুল প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ এবং লেবাননসহ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত মুসলিম বিশ্বের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে আসলে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্র নামক রাষ্ট্রগুলো কি সত্যিই মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করছে নাকি ইহুদিবাদী ইজরাইল ও পশ্চিমা রাষ্ট্রের গোলামী করছে?
যারা নিজেদের মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের দাবিদার, তারা কি কেবল নিজেদের সীমান্ত ও রাজতন্ত্র রক্ষা করবে? নাকি ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, লেবানন ও অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের মুসলিম জনগণের নিরাপত্তার প্রশ্নেও কার্যকর অবস্থান নেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো সন্তোষজনক নয়।
বরং মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশের কাছে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মুসলিম রাষ্ট্র পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে এমনভাবে সম্পর্কিত হয়ে পড়েছে, যেখানে তাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং বৃহত্তর মুসলিম স্বার্থ সবসময় এক নয়।
এ কারণেই তাদের ভূমিকা নিয়ে ‘মুনাফিক’, ‘গাদ্দার’ কিংবা ‘পশ্চিমা শক্তির সহযোগী’—এ ধরনের তীব্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভাষা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন মহলে ব্যবহৃত হচ্ছে। মক্কার নামে জোট—কিন্তু লক্ষ্য কার দিকে? এমন এক সময়ে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবকে ঘিরে কথিত ‘মক্কা জোট’ বা মুসলিম প্রতিরক্ষা কাঠামোর ধারণা সামনে এসেছে।
নামটি মক্কা। অর্থাৎ মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র নগরীর নাম। স্বাভাবিকভাবেই এর সঙ্গে মুসলিমদের নিরাপত্তা, ঐক্য ও সংহতির আবেগ জড়িত।
কিন্তু নাম দিয়ে তো ইতিহাস লেখা হয় না।
ইতিহাস লেখা হয় কর্মকাণ্ড দিয়ে।
তাই প্রশ্ন একটাই—
মক্কা জোট কাকে রক্ষা করবে?
মুসলিমদের?
নাকি সৌদি আরবের নিরাপত্তাকে?
ইসরাইলি আগ্রাসনকে প্রতিহত করবে?
নাকি ইরান ও তার মিত্রদের মোকাবিলা করবে?
ফিলিস্তিনকে রক্ষা করবে?
নাকি ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ানো প্রতিরোধশক্তিগুলোকে দমন করবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ‘মক্কা জোট’ নিয়ে সন্দেহ দূর হওয়ার কোনো কারণ নেই।
ইরান কি শত্রু, নাকি মুসলিম বিশ্বের প্রতিরোধের একটি কেন্দ্র?
ইরান গত প্রায় অর্ধশতক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে সামরিক চাপ—সবকিছুর মধ্যেও তেহরান তার নিজস্ব প্রতিরোধনীতি বজায় রেখেছে। আজ ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত যখন মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে, তখন ইয়েমেনের হুতি, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইরাকের ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সসহ বিভিন্ন প্রতিরোধশক্তি ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান করছে বলে তাদের সমর্থকেরা দাবি করছে।
এখানেই মুসলিম বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব।
যদি ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রতিরোধশক্তিকে মুসলিম বিশ্বের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে সামরিকভাবে দাঁড় করানো হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—
তাহলে মুসলিম প্রতিরোধের সংজ্ঞা কী?
আর যদি ইরান সেই প্রতিরোধশক্তিগুলোর অন্যতম প্রধান সমর্থক হয়, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে মুসলিম সামরিক জোট দাঁড় করানোর অর্থই বা কী?
সৌদি আরবকে ঘিরে প্রশ্ন আরও তীব্র
ইয়েমেনের হুতি ও সৌদি আরবের সংঘাত বহু বছরের। যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, পাল্টা হামলা এবং পরবর্তী যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে এই সংঘাত নানা পর্যায় অতিক্রম করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের স্বার্থে পাকিস্তান বা তুরস্ক যদি সামরিকভাবে হুতিদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—
এটি কি মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা, নাকি সৌদি নিরাপত্তার সামরিক গ্যারান্টি?
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের হুতিদের উদ্দেশে সতর্কবার্তার যে আলোচনা সামনে এসেছে, সেটিও এই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
যদি সৌদি আরবের ওপর হামলার ক্ষেত্রে পাকিস্তান-তুরস্ক-সৌদি কাঠামো সামরিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে এই জোটের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
কারণ একজন মুসলিমের কাছে প্রশ্নটি অত্যন্ত সরল:
যে জোট মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য তৈরি, তার সম্ভাব্য অস্ত্র কি একজন মুসলিম প্রতিরোধশক্তির দিকে তাক করা হবে?
তাহলে মুসলিমদের শত্রু কে?
এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ‘মুসলিম ঐক্য’ শব্দটি উচ্চারণ করা অর্থহীন।
ফিলিস্তিনে মুসলমান নিহত হচ্ছে।
গাজা ধ্বংস হচ্ছে।
লেবাননে হামলা হচ্ছে।
ইয়েমেন বছরের পর বছর যুদ্ধের ক্ষত বহন করছে।
ইরান ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে রয়েছে।
এই বাস্তবতায় মুসলিম বিশ্বের সামরিক শক্তির প্রধান অগ্রাধিকার কী?
ইসরাইলি আগ্রাসন প্রতিহত করা?
ফিলিস্তিনকে রক্ষা করা?
মুসলিম ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা?
নাকি ইরানকে পরাজিত করা?
এই একটি প্রশ্নের উত্তরই মক্কা জোটের প্রকৃত চরিত্র উন্মোচন করতে পারে।
পাকিস্তানের সামনে আরও বড় বিপদ
পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর।
একদিকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা। অভ্যন্তরে বেলুচিস্তান কেন্দ্রিক বিদ্রোহ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা। তার সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত।
এর ওপর পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।
এমন একটি রাষ্ট্র যদি ইরানবিরোধী বৃহত্তর যুদ্ধে প্রবেশ করে, তাহলে সেটি আর কেবল একটি সীমান্ত সংঘাত থাকবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাবে ভারত, আফগানিস্তান, ইরান, উপসাগরীয় রাষ্ট্র, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের স্বার্থ।
পাকিস্তানের জন্য তখন প্রশ্ন হবে—একসঙ্গে কতগুলো ফ্রন্ট সামলাবে?
ইরান সীমান্ত?
আফগানিস্তান?
ভারত?
বেলুচিস্তান?
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা?
আর পারমাণবিক শক্তিধর একটি মুসলিম রাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধে ঠেলে দেওয়ার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটিও পাকিস্তানকে হিসাব করতে হবে।
মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মুসলিম রাষ্ট্র—কার লাভ?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ইরান ও সৌদি আরব যদি সংঘাতে জড়ায়, কার লাভ?
ইরান ও পাকিস্তান যদি যুদ্ধে জড়ায়, কার লাভ?
তুরস্ক যদি ইরানবিরোধী সামরিক সংঘাতে নামে, কার লাভ?
আর মুসলিম প্রতিরোধশক্তিগুলো যদি মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সেনাবাহিনীর হাতে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে লাভবান হবে কারা?
এই প্রশ্নের উত্তর মুসলিম বিশ্বের মানুষ জানতে চাইতেই পারে।
কারণ ইতিহাসে দেখা গেছে, মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিভাজন যখন তীব্র হয়েছে, তখন বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ আরও সহজ হয়েছে।
মুসলমানের শক্তি যখন মুসলমানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে, তখন লাভবান হয়েছে তৃতীয় পক্ষ।
তাই মক্কা জোটের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—তারা মুসলিম বিশ্বের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করবে, নাকি মুসলিম বিশ্বের শক্তিকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবে?
ধর্মের ভাষায়ও প্রশ্নটি গুরুতর
মুসলিম হয়ে মুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং অমুসলিম শক্তির স্বার্থ রক্ষা করা—এই অভিযোগ মুসলিম বিশ্বের কাছে অত্যন্ত গুরুতর।
ইসলামী পরিভাষায় ‘মুনাফিক’, ‘গাদ্দার’, ‘কাফের’ কিংবা ‘মুশরিক’—এসব শব্দের ধর্মীয় তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকে চূড়ান্তভাবে এসব পরিচয়ে চিহ্নিত করার আগে ধর্মীয় ও প্রামাণ্য ভিত্তি বিবেচনা করা জরুরি।
কিন্তু রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নটি থেকেই যায়।
যদি কোনো মুসলিম রাষ্ট্র এমন সামরিক পদক্ষেপ নেয়, যার ফলাফল হয় ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী অন্য মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করা, তাহলে সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার মুসলিম জনগণের রয়েছে।
আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে ওই রাষ্ট্রকেই।
মক্কা জোটের সামনে এখন ইতিহাসের পরীক্ষা
মক্কার নামে জোট তৈরি হয়েছে—এটি নিজেই যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন হলো, সেই জোটের অস্ত্র কোন দিকে তাক করা?
ইসরাইলের দিকে?
আমেরিকার সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে?
নাকি ইরানের দিকে?
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে?
নাকি ফিলিস্তিনপন্থী প্রতিরোধশক্তির বিরুদ্ধে?
মুসলিম বিশ্বের সামনে এখন আর আবেগের জায়গা নেই। এখন দরকার জোটের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা।
যদি মক্কা জোট সত্যিই মুসলিম বিশ্বের প্রতিরক্ষা জোট হয়, তাহলে তার প্রথম দায়িত্ব হবে মুসলিম ভূখণ্ডের নিরাপত্তা, ফিলিস্তিনের প্রশ্নে কার্যকর অবস্থান এবং বহিরাগত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের সার্বভৌমত্ব রক্ষা।
কিন্তু যদি সেই জোট শেষ পর্যন্ত ইরান, হুতি, হিজবুল্লাহ, হামাস কিংবা অন্য কোনো মুসলিম প্রতিরোধশক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়, তাহলে ইতিহাসের প্রশ্ন আরও কঠিন হয়ে যাবে:
এটি কি মুসলিম প্রতিরক্ষা জোট, নাকি মুসলিমদের বিভক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর নতুন সামরিক কাঠামো?
শেষ কথা: নাম নয়, অস্ত্রের দিকই পরিচয় নির্ধারণ করবে
মক্কা মুসলিম বিশ্বের হৃদয়।
পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।
তুরস্ক মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তি।
এই তিন শক্তির সমন্বয়ে কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে উঠলে সেটি নিঃসন্দেহে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
কিন্তু সেই শক্তি কোন দিকে ব্যবহৃত হবে—সেটিই আসল কথা।
মুসলিমদের রক্ষায়?
নাকি মুসলিমদের বিরুদ্ধে?
ইসরাইলি আগ্রাসন ঠেকাতে?
নাকি ইরানকে মোকাবিলা করতে?
ফিলিস্তিনকে রক্ষা করতে?
নাকি ফিলিস্তিনপন্থী প্রতিরোধকে দমন করতে?
মক্কা জোটের ভবিষ্যৎ এখানেই নির্ধারিত হবে।
কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত জোটের নাম মনে রাখে না—মনে রাখে তার কর্মকাণ্ড।
যে জোট মুসলিমদের রক্ষার নামে গঠিত হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুসলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলে, তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
আর যদি সত্যিই কোনো মুসলিম রাষ্ট্র ইরান কিংবা ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধশক্তির বিরুদ্ধে পশ্চিমা ও ইসরাইলি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সামরিক অবস্থান নেয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রকে মুসলিম বিশ্বের কাছে নিজের অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে হবে। তখন আর ‘মুসলিম জোট’ শব্দটি যথেষ্ট হবে না।
তখন প্রশ্ন হবে—
কার মুসলিম জোট?
কাদের বিরুদ্ধে?
কার স্বার্থে?
আর শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি দাঁড়াবে—
মুসলমানের হাতে মুসলমানের রক্ত—এই যুদ্ধের বিজয়ী আসলে কে?
সময়ের সঙ্গে মক্কা জোটের উত্তর স্পষ্ট হবে।
তখন বোঝা যাবে—এটি মুসলিম বিশ্বের রক্ষাকবচ ছিল, নাকি মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে আরেকটি নতুন যুদ্ধের দরজা।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।